বাংলাদেশে স্বশস্ত্র পদ্ধতির জিহাদ কতটুকু কার্যকরী ?
উপমহাদেশের মূলধারার আলেমরা কেন স্বশস্ত্র পদ্ধতির জিহাদে আগ্রহী না

শিল্পবোদ্ধারা একটা কথা বলেন— ” তুমি যদি পৃথিবীর কোনো স্থানকে স্বর্গ বানাতে চাও, তাহলে ফরাসীদেরকে দাও শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতি চর্চার দায়িত্ব ; জার্মানদেরকে দাও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের দায়িত্ব; আর ব্রিটিশদেরকে দাও ঐ এলাকার প্রশাসনিক দায়িত্ব। তাহলেই পৃথিবীর সেই জায়গাটা স্বর্গে পরিণত হবে।
অর্থাৎ, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় ফরাসীদের দক্ষতা ঈর্ষণীয়। জার্মানরা বিজ্ঞান চর্চায় কতটুকু অগ্রগামী, তা Physics এর বইটা উল্টালেই বুঝা যায়। আর ব্রিটিশরা Administration চালাতে কতটুকু দক্ষ, তার সাক্ষী তো আমরা ভারতীয়রা। দেখা গেছে, একটা District এ মাত্র একজন ইংরেজ, আর তিনি হচ্ছেন সেই জেলার DC; সেই ব্রিটিশ DC ই পুরো জেলাটা চালাতেন। এত বড় ভারতবর্ষ অল্প কিছু ইংরেজ পরিচালিত করেছে, শুধু তাদের প্রশাসনিক দক্ষতার জোরে।

ফরাসীরা পুরো আফ্রিকা মহাদেশকে তাদের উপনিবেশ বানিয়েছে, কিন্তু ফরাসীরা আফ্রিকায় শুধু লুটপাটই করেছে। কোনো অবকাঠামো তৈরি করেনি। অর্থাৎ, ব্রিটিশরা যেমন Court কাচারি, সেনাবাহিনী, পুলিশ, সীমান্তরক্ষী, সচিবালয় এরকম অনেক প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো তৈরি করেছিল, ফরাসীরা আফ্রিকায় তার কিছুই করে নি। সেজন্য আপনি চাইলেই আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকা কোনো মিলিশিয়া বাহিনী দ্বারা দখল করে ফেলতে পারবেন, কেউ আপনাকে বাধাও দেবে না। ঐ রাজধানী Capital থেকে সেনাবাহিনী না আসলে আপনাকে বাধা দেবার আর কেউ নেই। আর সেজন্যই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনের আফ্রিকায় এত চাহিদা !
কিন্তু ঠিক এই কাজটাই যদি আপনি ভারতীয় উপমহাদেশের কোন জায়গায় করতে চান, তাহলে আপনাকে প্রথমে স্থানীয় থানা পুলিশের সাথে Fight করতে হবে ; এরপরে RAB, BGB আর সর্বশেষ সেনাবাহিনী। অর্থাৎ, ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনাবাহিনী আসার আগেই আপনাকে কমপক্ষে ৩ টা সরকারি বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হবে। কিন্তু আফ্রিকা মহাদেশ, ইয়েমেন বা আফগানিস্তানে এইসবের কোনো বালাই নেই।
আগেই বলেছি, ব্রিটিশরা যেইসব দেশে উপনিবেশ স্থাপন করেছে, সেইসব দেশেই একটি শক্তিশালী আমলাতন্ত্র বা Bureaucracy প্রতিষ্ঠা করে গেছে। একজন সিপাহি মরতে ভয় পায় না, কারণ সে জানে, সে মরলে তার পুত্র পোষ্য কোটায় সরকারি চাকরি পাবে, তার স্ত্রী আজীবন পেনশন পাবে। আর সেজন্যই ব্রিটিশ আমলের প্রতিষ্ঠিত সেনাবাহিনীর সদস্যরা জীবন-মরণ দিয়ে যুদ্ধ করে।
একটা কথা প্রচলিত আছে, “BMA Bangladesh Military Academy এর ঘাসে সেনাবাহিনীর রক্ত লেগে আছে।” এখন আপনি যতই এদেরকে তাগুত-কাফের বলেন না কেন, এরা তো একটা দীর্ঘমেয়াদি ট্রেনিংপ্রাপ্ত, প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী। হয় আপনার ৩/৪ টা বাহিনীর সাথে Fight করে টিকে থাকার মতো যোগ্যতা লাগবে, না হয় আপনি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্য স্বশস্ত্র পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোনো পদ্ধতি বেছে নেবেন।
ব্রিটিশরা চলে গেলেও ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া অবকাঠামো এখনো ভারতীয় উপমহাদেশে সচল আছে ; বরং এই প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হয়েছে। প্রতিবছর সেনাবাহিনী, পুলিশ, BGB-তে শত শত লোক নিয়োগ দেওয়া হয়। আর সেজন্যই এই উপমহাদেশের আলেমরা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্য দাওয়াত, তাবলীগ আর ইলমের পথকেই বেছে নিয়েছে। স্বশস্ত্র পদ্ধতির জিহাদ যে উপমহাদেশে কার্যকরী নয় এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল কাশ্মীর। একটা প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কয়েকটা মিলিশিয়া দল কিছুই করতে পারে না।

আফগানিস্তান দেশটা সবসময় স্বাধীন ছিল, কোনো পরাশক্তিই আফগানিস্তানকে কখনোই কব্জা করতে পারে নাই। ঠিক তেমনি আফগানিস্তানে কখনোই আমলাতন্ত্র বা Bureaucracy প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। যদি আফগানিস্তান দেশটায় ভারতীয় উপমহাদেশের মতো শক্তিশালী স্বদেশী সেনাবাহিনী, পুলিশ, সীমান্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চালু থাকত, তাহলে তালেবানদের পক্ষে আফগানিস্তান দখল করা একপ্রকার অসম্ভবই ছিল। আফগানিস্তানের এই প্রশাসনিক শুন্যতা মূলত তালেবানদের দ্বারাই পূর্ণ হয়েছে। বলা যায় না ভবিষ্যতে আফগানিস্তানে শক্তিশালী কোন সেনাবাহিনী তৈরী হলে হয়ত তারাই তালেবানদের প্রতিদ্বন্দ্বী হবে।