বাংলাদেশ

জেলখানার সবচেয়ে কষ্টদায়ক কাজ কি ?

Night চৌকার সেই অন্ধকার রাতগুলো

বাংলাদেশের কারাগার গুলোর যেইসব বিভীষিকাময় রুপ আমি অবলোকন করেছি এর মাঝে সবচেয়ে ভয়াবহ রুপটা ছিল Night চৌকা। জেলখানার রান্নাঘরকে চৌকা বলা হয়। যারা রাতে রুটি বানায় তাদের কাজের দফা কে নাইট চৌকা বলা হয়। আর যারা দিনে ভাত রান্না করে তাদের দফাকে দিন চৌকা বলা হয়। তো এক একটা জেলখানায় যে ২/৩ হাজার করে আসামি থাকে তারা যে সকাল বেলায় উঠে গরম রুটি খাবে সেই রুটিটা তো কাউকে না কাউকে বানাতেই হবে। হয় আসামি নয় কারারক্ষী কেউ না কেউ তো রুটি বানাবেই। কারারক্ষীদের কে দিয়ে তো কোন কাজ করানো হয় না কারন তারা সরকারি চাকুরীজীবি। জেলখানার যত কাজ সব কয়েদিরাই করে। কারারক্ষীদের কাজ শুধু আসামীদের কে ধরে ধরে পিটানো।
তো রাত ১১ টা থেকে ভোর ৫ টা পর্যন্ত কয়েদীদের দিয়ে রুটি বানাতে হত। যেন আসামিরা ভোরে উঠে সকাল সকাল গরম রুটি খেতে পারে। কয়েদিরা এই কাজ করতে চাইত না। কারন এটা তো একটা অসম্ভব ব্যাপার যে আপনি রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু রুটি বানাবেন। আপনাকে যদি কোন কাজ না করিয়ে শুধু সারারাত দাঁড় করিয়ে রাখা হয় তাতেই তো আপনি পাগল হয়ে যাবেন। আর এখানে সারারাত আপনার উপর কি ধকল টাই না যাবে ! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ৬ ঘন্টা উত্তপ্ত তন্দুরে রুটি বানানো কত কষ্টদায়ক এক কাজ ! কি মাইরটাই দিয়েই না কয়েদিদের কে দিয়ে এই নাইট চৌকায় কাজ করতে বাধ্য করা হত। কারারক্ষীরা আসামীদের এক একটা বারি যে দেয় ৭ মণ ওজন !
কারাগারে অবৈধ ফোন ব্যবহারে ৩০০ কর্মীর শাস্তি, আরও কঠোর হচ্ছে কর্তৃপক্ষ |  Campus Times
এরপরেও অনেক যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা মাইর খাবার পরেও নাইট চৌকায় কাজ করতে চাইত না। অনেক ঝামেলা করত। এইজন্য পরবর্তীতে যাদের অল্প সাজা তাদেরকে দিয়েই নাইট চৌকায় বেশী কাজ করানো হত। যেমন চেক জালিয়াতি, মাদক মামলা, দ্রুত বিচার ছিনতাই মামলায় যারা আসে তাদের সাজা সাধারণত ১/২ বছর হয়। দেখা যায় তাদের কে দিয়েই বেশী নাইট চৌকায় কাজ করানো হত।
আর হ্যাঁ জেলখানার ভিতরে ক্যান্টিনও আছে মানে নিজ টাকায় যেখানে ভালো খাবার পাওয়া যায়। ক্যান্টিনে সকাল বেলায় পরোটা বিক্রি করা হয়। তো এই পরোটা বানানোর জন্যও কিছু কয়েদিকে রাত ৩ টা থেকে ক্যান্টিনে কাজে লাগিয়ে দেওয়া হত। তবে ক্যান্টিনে রাতে কাজ করতে কয়েদীদের তেমন একটা আপত্তি থাকত না কারন তার কাজটা শুরুই হত রাত ৩ টার দিকে। আর ক্যান্টিনে কাজ করলে কিছু ভালো খাবার দাবার পাওয়া যেত। ক্যান্টিনে কাজ করে একজন কয়েদি জেলের ভিতরে মোটামুটি ভালভাবেই চলতে পারত। যা কষ্ট তা সব এই নাইট চৌকায়। কিন্তু এই আধুনিক যুগে একটা রুটি বানানোর মেশিন কি খুব দুস্পাপ্য না ব্যয়বহুল ? একটা স্মার্ট ব্রেড মেকিং মেশিন হলেই তো মানুষ কে এই জানোয়ারের মত খাটানো লাগে না। দাসপ্রথার যুগেও তো মনে হয় এত কষ্ট ছিল না এই আধুনিক যুগের নাইট চৌকায় যত কষ্ট ! আর হ্যাঁ কারাগারকেই বলা হয় আধুনিক দাসপ্রথা ! আসামীরা তো কষ্ট করবেই এটাই আসামীদের নিয়তি !
৫ ই আগষ্টের পরে আমি জেলার সুপারের সাথে কথা বলে এই নাইট চৌকার বিভীষিকাময় রুপটা বন্ধ করতে বলেছিলাম। তো উনারা আমাকে বলল ব্রিটিশ আমলের জেলকোড বাতিল না করা পর্যন্ত এই নাইট চৌকার কাজের সিস্টেম উনারা পরিবর্তন করতে পারবেন না।
২০২১ সালে অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার আমার সাজা হয়ে যাবার পর আমি যেই বিল্ডিং এ থাকতাম শৈবাল বিল্ডিং, সেই বিল্ডিংয়ের নীচতলায় Night চৌকার কয়েদীরা থাকত। তো রাত ১১ টার সময়ে কয়েদিদের কে রুম থেকে বের করা হত রুটি বানানোর জন্য। অনেক কয়েদি অসুস্থ থাকত রুটি বানাতে চাইত না। তো কারারক্ষীদের মাইরধর সেই রাত ১১ টা থেকেই শুরু হয়ে যেত। লাঠির আওয়াজে আমাদের ঘুম ভেঙে যেত। এরপরও আমরা নিজেদেরকে সভ্য জাতি বলে দাবি করি।
আমার সাজা ছিল ৩৯ বছর। তাই কারা কর্তৃপক্ষ আমাকে দিয়ে কোন কাজ করায় নাই। কারণ একটা মানুষ বাঁচেই বা কয়দিন ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button