
আল্লাহর রাসূল উম্মতকে শরীয়াহ শিক্ষা দিয়েছেন কিন্তু উনার ব্যক্তিগত কার্যাবলী আমাদের উপর চাপিয়ে দেননি। ব্যাপারটা একটু সহজভাবে বুঝিয়ে বলি। আমাদের নবীজি যয়তুনের তৈল দিয়ে যবের রুটি আহার করতেন। যব মানে জাঁতায় ভাঙ্গানো যব নয়, পাথরে পেশা ছিল। পাথরে পিষে ফুঁ দিলে খোসা উড়ে যেত, সেই যব আমাদের নবীজী খেতেন।
এখন আল্লাহর রাসূল যদি আমাদেরকে যয়তুনের তৈল ও যবের রুটি খাওয়ার নির্দেশ দিতেন, তাহলে আমাদের শরীর তা হজম করার উপযুক্ত ছিল না। প্রকৃতপক্ষে নবীদের ঘরের ভিতরের ব্যক্তিগত জীবন, তা পালন করার ক্ষমতা আমাদের কারো নেই। আমাদের কাজ হলো বৈধ কাজের সীমার মধ্যে থেকে অবৈধ কাজ থেকে বিরত থাকা। আল্লাহর রাসূল স্বর্ণ-রৌপ্য থেকে ঘর পবিত্র না করা পর্যন্ত সালাত আদায় করেননি। আমাদের কি এই হিম্মত আছে আমাদের ঘরে যত স্বর্ণ-রৌপ্য রয়েছে, তা আমাদের মা-বোন ও স্ত্রীদের কাছ থেকে নিয়ে সব সদকা করে ঘর পবিত্রযর করার ? কার সাহস আছে আজ থেকে সব ভালো ভালো খাবার বাদ দিয়ে যয়তুনের তেল দিয়ে যবের রুটি খাওয়া শুরু করা।
ব্যাপারটা আরো সহজভাবে বুঝিয়ে বলি। সুন্নত বলতে আসলে আমরা কি বুঝি ? সুন্নত হল সেটাই যেটা আল্লাহর রাসূল করতে বলেছেন। যেমন উটের পিঠে চড়া সুন্নত না কিন্তু মেসওয়াক করা সুন্নত। আমাদের নবীজি কখনোই ভাত খান নি কারণ সেই সময়ে আরবে ভাত খাওয়ার প্রচলন ছিল না। সাহাবীরা প্রথম ভাত খান ইরানে যেয়ে। সাহাবীরা প্রথমে ধান উনাদের ঘোড়া কে খাওয়ান। এরপর সাহাবীরা বুঝতে পারেন যে ধান মানুষেরা খেতে পারবে। [ আসহাবে রাসূলের জীবন কথা ]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কোন নবীকেই তার গোত্রের দ্বারা এমন দুঃখ-কষ্ট বা নির্যাতন করা হয়নি, যতটুকু কষ্ট আমাকে দেওয়া হয়েছে।” অথচ বাহ্যিকভাবে মনে হয় যে, হযরত নূহ আলাইহিস সাল্লাম অধিক কষ্ট ভোগ করেছেন। কারণ, দীর্ঘ ৯৫০ বছর উনি উনার ক্বওমে দ্বীন প্রচার করেছেন, কিন্তু ক্বওম উনাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করেছে। হযরত নূহ আলাইহিস সাল্লাম এর ক্বওম থেকে মাত্র ৮০ জন ব্যক্তি মুসলমান হয়েছিল। হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম কাফের বাদশা ফেরাউন কর্তৃক অনেক কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু আমাদের নবীজির সাথে কোন কাফের বাদশার সরাসরি সংঘাত হয়নি।
তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেন বলেছেন যে, যত কষ্ট উনি ভোগ করেছেন, অন্য কেউ এত কষ্ট ভোগ করেনি?
এর কারণ হলো, যার প্রতি আপনার ভালোবাসা ও হৃদ্যতা যত গভীর হয়, তার থেকে প্রাপ্ত সামান্য পরিমাণ কষ্ট ও অধিক মনে হয়। আপনি এই ভেবে কষ্ট পাবেন যে, “আমি তাকে এত ভালোবাসি, আর সে আমাকে এই কটু কথাটা বলল!” বস্তুত, মানবজাতির প্রতি আল্লাহর রাসূলের স্নেহ-মমতা ও ভালোবাসা ছিল সীমাহীন। তাই তাদের কাছ থেকে পাওয়া দুঃখ-নির্যাতন উনার কাছে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাবে অনুভূত হতো। এ কথা কোরআনেও বলা আছে—ওরা বিশ্বাস করে না বলে অকালে হয়তো আপনি মনোকষ্টে আত্মঘাতী হয়ে পড়বেন (সূরা শুআরা, আয়াত: ৩)।
মানবজাতির প্রতি আল্লাহর রাসূলের চূড়ান্ত পর্যায়ের স্নেহ-মমতা ও ভালোবাসার কারণে স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের নবীজিকে বাধা প্রদান করেন যে, আপনি তাদেরকে এত স্নেহ-মমতা করবেন না, যাতে তাদের ঈমান না আনার কারণে আপনি অসহায় মন:স্তাপে মনোক্লিষ্ট হবেন।
বুখারী শরীফের ৬১১৯ নং হাদিস মতে, আল্লাহর রাসূল ততক্ষণ পর্যন্ত মানবজাতির জন্য সুপারিশ করবেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না কুরআন উনাকে থামাবে। অর্থাৎ, চিরস্থায়ী জাহান্নাম যাদের জন্য নির্ধারিত, তারা ব্যতীত আর সবাই আল্লাহর রাসূলের সুপারিশে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবেন।
[ ৬১১৯। মুসাদ্দাদ (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা সমস্ত মানুষকে একত্রিত করবেন। তখন তারা বলবে, আমাদের জন্য আমাদের রবের কাছে যদি কেউ শাফাআত করত, যা এ স্থান থেকে আমাদের উদ্ধার করত। তখন তারা সকলেই আদম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে এসে বলবে, আপনি ঐ ব্যাক্তি যাকে আল্লাহ তাআলা স্বহস্তে সৃষ্টি করেছেন। আপনার মাঝে নিজে থেকে রুহ ফুকে দিয়েছেন এবং ফেরেশতাদের হুকুম করেছেন; তারা আপনাকে সিজদা করেছে। অতঃপর আপনি আমাদের জন্য আমাদের প্রভুর কাছে শাফাআত করুন। তখন তিনি বলবেনঃ আমি তোমাদের জন্য এ কাজের উপযোগী নই এবং স্বীয় অপরাধের কথা উল্লেখ করবেন। এরপর বলবেন, তোমরা নূহ (আলাইহিস সালাম) এর কাছে চলে যাও যাকে আল্লাহ প্রথম রাসুল হিসাবে প্রেরণ করেছেন।
তখন তারা তাঁর কাছে আসবে। তিনিও স্বীয় অপরাধের কথা উল্লেখ করে বলবেনঃ আমি তোমাদের জন্য এ কাজের উপযোগী নই। তোমরা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে চলে যাও, যাকে আল্লাহ তা’আলা খলীলরূপে গ্রহগ করেছেন। অতঃপর তারা তার কাছে আসবে। তিনিও স্বীয় অপরাধের কথা উল্লেখ করে বলবেনঃ আমি তোমাদের এ কাজের উপযোগী নই। তোমরা মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে চলে যাও, যার সঙ্গে আল্লাহ তা’আলা কথা বলেছেন। তখন তারা তার কাছে আসবে। তিনিও বলবেনঃ আমি তোমাদের জন্য এ কাজের উপযোগী নই। এবং স্বীয় অপরাধের কথা উল্লেখ করবেন। তিনি বলবেনঃ তোমরা ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে চলে যাও।

তখন তারা তাঁর কাছে আসবে। তখন তিনিও বলবেনঃ আমি তোমাদের জন্য এ কাজের উপযোগী নই। তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে চলে যাও। তাঁর পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। তখন তারা সকলেই আমার কাছে আসবে। তখন আমি আমার রবের কাছে অনুমতি চাইব। যখনই আমি আল্লাহ তা’আলাকে দেখতে পাব তখন সিজদায় পড়ে যাব। আল্লাহ ত’আলার যতক্ষন ইচ্ছা আমাকে এ অবস্থায় রাখবেন। এরপর আমাকে বলা হবে, তোমার মাথা উঠাও। সাওয়াল কর, তোমাকে দেওয়া হবে। বল; তোমার কথা শ্রবণ করা হচ্ছে। শাফাআত কর; তোমার শাফাআত কবুল করা হবে।
তখন আমি মাথা উত্তোলন করব এবং আল্লাহ তা’আলা আমাকে যে প্রশংসার বাণী শিক্ষা দিয়েছেন তার মাধ্যমে তাঁর প্রশংসা করব। এরপর আমি সুপারিশ করব, তখন আমার জন্য সীমা নির্ধারন করে দেয়া হবে। অতঃপর আমি তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে বেহেশতে প্রবেশ করিয়ে দেব। এরপর আমি পুর্বের ন্যায় পুনঃ তৃতীয়বার অথবা চতুর্থবার সিজদায় পড়ে যাব। অবশেষে কুরআনের বাণী মুতাবিক যারা অবধারিত জাহান্নামী তাদের ব্যতীত আর কেউই জাহান্নামে অবশ্যই থাকবে না। কাতাদা উক্ত আঘাতের ব্যাখ্যায় তখন বলেছিলেন, চিরস্থায়ী জাহান্নাম যাদের জন্য অবধারিত হয়েছে। ]
তবে আল্লাহর রাসূলের এই শাফায়াত পাওয়ার শর্ত হলো—উনার প্রতি ঈমান আনতে হবে এবং উনাকে শেষ নবী বলে স্বীকার করতে হবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, মানবজাতির প্রতি যে নবীজির এত ভালোবাসা ছিল, সেই নবীজিকে গালিগালাজ করেই অনেক নাস্তিকের সংসার চলে। খ্রিস্টান মিশনারীদের টাকায় যাদের সংসার চলে, আল্লাহর রাসূলকে গালিগালাজ না করলে তাদের হাড়িতে ভাত চড়ে না।
বুখারী শরীফের ৬১১৯ এই হাদীসটা নিয়ে সমাজ তত্ত্ববিদদের গবেষণা করা উচিত। আল্লাহর রাসূল ততক্ষণ পর্যন্তই মানব জাতির জন্য সুপারিশ করতে পারবেন যতক্ষণ পর্যন্ত কোরআন উনাকে না থামাবে। খুবই significant এই হাদিস টা। আমি এটারই নাম দিয়েছি ” মহাকালের সমাপ্তি এবং শুরু। “