পর্যালোচনা

বাংলাদেশে জিহাদী আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ ?

স্বশস্ত্র জিহাদের আগে-পরে

ফেনী-চট্টগ্রাম এইসব এলাকায় বিয়ে বাড়ির মূল অনুষ্ঠানের আগে সাধারণত পিঠা খাওয়ানো হয়। মূল Rich food পরে দেওয়া হয়। তো এক লোক বিয়ে বাড়িতে গিয়ে ভাবছে, এখানে মূল খাবার মনে হয় পিঠাই। তাই এই লোক প্রাণ ভরে পিঠা খেয়ে পেট ভরে ফেলল। একটু পর যখন বিয়ে বাড়ির মূল খাবার, অর্থাৎ পোলাও-কোরমা, দেওয়া হলো, তখন সবাই রিচ ফুড খাচ্ছে। কিন্তু সেই লোকটা আর কিছু খেতে পারছে না, কারণ সে তো আগেই পিঠা খেয়ে পেট ভরে ফেলেছে।

তখন সে হায় হায় করে কান্নাকাটি করে বলছে, “হায় ! আমি তো জানতাম এটা পিঠা খাওয়ার উৎসব। এখানে যে এত ভালো খাবার দেবে, সেটা তো আমি জানতাম না।” আর অন্য লোকেরা, যারা ভালো খাবারের আগে পিঠা খায়নি, তারা তখন পেট ভরে পোলাও-কোরমা খাচ্ছে।

আমাদের দেশে অনেক আগে থেকেই জিহাদের কাজকর্ম চলছে, বা বহু লোকই সশস্ত্র জিহাদ করতে চাচ্ছে। একদম প্রথম থেকে ধরলে জেএমবি ও হুজি—এই দুইটা সংগঠনের নাম আসে। এদের জিহাদি কার্যক্রমের দৃষ্টান্ত ছিল এরকম: “আপনি নামাজ পড়েন না, ঠিক আছে, আমি আপনার এখানে একটা বোম মেরে দিলাম।”

যদিও হুজি সংগঠনটা তৈরি হয়েছিল আফগান-ফেরত মুজাহিদদের কর্তৃক ৮০ এর দশকে। হুজিদেরকে যারা প্রমোট করছিল, তাদের মূল টার্গেট ছিল আরাকানমুখী জিহাদকে অগ্রগামী করা, রোহিঙ্গাদের সাহায্য করার জন্য। মূলত আরাকান কে স্বাধীন করার জন্যই সেই সময় হুজি সংগঠনটা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু পাহাড়ে উঠা কষ্টকর, পাহাড়ে প্রচুর মশা সেই জন্যই হয়তো হুজিরা পাহাড় থেকে সমতলমুখী জিহাদে নিজেদেরকে নিয়োজিত করে।

বেগম খালেদা জিয়া ইসলাম ধর্মের প্রতি সফট ছিলেন, এটা আমরা সবাই জানি। সেই সময়ের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো খালেদা জিয়াকে এইসব সংগঠনের ব্যাপারে অনেক সতর্ক করেছিল। কিন্তু জেএমবি ও হুজি—এই দুইটা সংগঠন সেই সময় জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ধ্বংস করার জন্য উঠে-পড়ে লাগবে, এটা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। কিন্তু BNP এর সময়ই এই দুইটা সংগঠন সারা দেশে তাদের দাওয়াতি কার্যক্রম বেগবান করেছে। কিন্তু তাদের কার্যক্রম ছিল অনেকটা বিএনপিকে পেছন দিয়ে ছুরি মারার মত। জাতীয়তাবাদী শক্তি ছিল ইসলামের সহায়ক। কিন্তু জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ইসলামবিরোধী বানানোর খেসারত আমরা এখনো দিচ্ছি।

এরপরে বাকি থাকে শেখ হাসিনার সময়ে বাকি কিছু জিহাদি দলের কথা। দেশের জিহাদি আন্দোলনের যতটুকু শক্তি অবশিষ্ট ছিল, তাদের বিবৃতি টাইপ জঘন্য কাজের কারণে তাও নিঃশেষ হয়ে যায়। ২০১৫–১৬ সালে আনসার আল ইসলাম ও আইএস এই দুইটা জিহাদি সংগঠন প্রচুর বিবৃতি দেয়। আমার অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার সাথেও তাদের বিবৃতি জড়িয়ে আছে। এক একটা হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর সাতবার বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, এরকম দৃষ্টান্তও আছে। সেই সময় এই বিবৃতিগুলো দেশের ইসলামিস্টদের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করে। পুলিশ খুঁজে খুঁজে সারা দেশে ইসলামিস্টদের গ্রেফতার করা শুরু করে। বিশেষ করে যারা সালাফি আকিদার বা আহলে হাদিস পরিবারের, তাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন নেমে আসে।

Filip Stojanovic - Two-headed eagle sword

ঘরের ভেতরের কথাগুলো আপনাদেরকে এইজন্যই জানালাম যে বিয়ে বাড়ির ঐ অনুষ্ঠানে ঐ ব্যক্তি পিঠা খাওয়ার কারণে যেমন আর পোলাও-কোরমা খেতে পারেনি, ঠিক তেমনি দেশের জিহাদি সংগঠনের নেতাদের তাড়াহুড়ার কারণে “জিহাদ” শব্দটা এখন দেশের মানুষের কাছে একটা আতঙ্কের শব্দে রূপান্তরিত হয়েছে। আর সেই জন্য ২০১৭–১৮ সালে রোহিঙ্গা ইস্যুর সময় আমরা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখেছি। যেহেতু আমরা আগেই পিঠা খেয়ে ফেলেছি, তাই রোহিঙ্গাদের জন্য আমরা পোলাও-কোরমার ব্যবস্থাটা করতে পারলাম না।

যদি আশির দশক থেকে দেশের জিহাদি শক্তিকে সঞ্চিত করে রাখা যেত, তাহলে ঠিকই ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদেরকে কেন্দ্র করে দেশে একটা বিপ্লবী জিহাদের ডাক দেওয়া যেত। সেনাবাহিনীর একটা অংশের সাপোর্টও পাওয়া যেত। এখন দেশের জিহাদি বলয়ের যতটুকু শক্তি অবশিষ্ট আছে, তারা মূলত সারাদিন কীভাবে হাইকোর্টে তাদের জামিন বর্ধিত করা যাবে, ডেথ রেফারেন্স খালাস করা যাবে, সেই ধান্ধায় আছে। এখন উচ্চ আদালতই তাদের জিহাদের ক্ষেত্র।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button