
আসমানী জ্ঞান বা ওহী বা নবুয়্যতকে যদি আমরা একটা আকাশ হিসেবে ধরি, তাহলে সর্বপ্রথম এই আকাশের তারকা হলেন হযরত আদম আলাইহিস সাল্লাম। হযরত আদম আলাইহিস সাল্লাম তারকা রূপে এসে প্রথম এই নবুয়্যতের আকাশে আলো ছড়ান। এরপর এই নবুয়্যতের আকাশে পর্যায়ক্রমে আরো অনেক নবী-রাসূলের তারকারূপে আগমন ঘটে। নবুয়্যতের আকাশ তারকারাজিতে পূর্ণ হয়ে গেলে, কিন্তু দুনিয়া আলোকিত হল না। অর্থাৎ দিনের অভ্যুদয় হল না। আকাশের টিমটিম আলো দিয়ে কি আর সূর্যের কাজ চলে ? মানবজাতি পূর্ণ আলোকধারা পাওয়ার জন্য উৎসুক হয়ে রইল। এরপর দীর্ঘ সময় পর নবুয়্যতের আকাশে সূর্যরূপে আল্লাহ রাসূলের আবির্ভাব হলো।

রাতের আকাশে লক্ষ কোটি তারা এবং চাঁদ উদিত হয়। সবাই মিলে আলো বিকিরণ করা সত্ত্বেও রাত শেষ হয় না। দিন আগমন করে না। কিন্তু সুবহে সাদিকের সময়ে একটি মাত্র সূর্যের আবির্ভাবে রাতের সমস্ত আঁধার তিরোহিত হয়। সমগ্র বিশ্ব আলোকময় হয়ে যায়।
এর মানে এই নয় যে সূর্য তারকার আলো ছিনিয়ে নিয়েছে। তারকার আলো স্বস্থানেই আছে, কিন্তু সূর্যরশ্মির প্রখরতার কারণে এই আলো নিস্প্রভ হয়ে গেছে। এখন যদি সূর্য বলে, আমি সমস্ত আলোর সমাপ্তকারী, আমার পর আর কোন আলোর প্রয়োজন নেই। তাহলে সূর্যের এই কথার সাথে কেউ দ্বিমত করবে না। ঠিক তেমনি আল্লাহ রাসূলের আবির্ভাবের মাধ্যমে নবুয়্যত পূর্ণাঙ্গ হয়েছে। এখন আর নবুয়্যতের সম্প্রসারণের আর কোনো প্রয়োজন নেই। এখন আর নবী হিসেবে কাউকে প্রেরণ করা হবে না। সূর্যাস্ত পর্যন্ত যেমন সূর্যের আলো ব্যতীত আর কোনো আলোর প্রয়োজন নেই, ঠিক তেমনি কেয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ রাসূলের নবুয়্যতের সূর্য, উনার নূর বা আলোই আমাদের জন্য যথেষ্ট।
চাঁদের যেমন নিজস্ব কোনো আলো নেই, সূর্যের আলোই চাঁদের উপর প্রতিফলিত হয়। ঠিক তেমনি কেয়ামত পর্যন্ত যত মুহাদ্দিস, ফকীহ, অলি-আউলিয়া আসবেন, তাদের মাঝে খতমে নবুয়্যতেরই নূরই প্রকাশিত হবে। উনাদের নিজস্ব কোনো নূর থাকবে না। নবুয়্যতের নূর থেকেই উনাদের নূর প্রকাশিত হবে। কারো মাঝে ইলমের নূর থাকবে, কারো মাঝে আখলাকের নূর থাকবে, কারো মাঝে দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি ও যুহদের নূর উদ্ভাসিত হবে।
নবুয়্যতের স্তর হলো দুইটি। একটি ইলমের পূর্ণতা, আরেকটি হল আখলাকের পূর্ণতা। বস্তুত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইলম ও আখলাক হলো সর্বশ্রেষ্ঠ।
আবূ হুরাইরা রদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
“আমি তো প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দান করার জন্যে।” [হাসান] – [এটি বুখারী, আদাবুল মুফরাদে, আহমদ ও বাইহাকী বর্ণনা করেছেন।] – [বাইহাকীর সুনানুল কুবরা – 20819]
আবার আখলাক সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই আপনি সর্বোত্তম আখলাকের উপর প্রতিষ্ঠিত। আখলাকের চূড়ান্ত স্তর আপনাকে দান করা হয়েছে। [ সূরা কলম, আয়াত চার]
ফ্রিজে যখন কারেন্ট প্রবাহিত হয়, তখন ইনভার্টার বা কম্প্রেসরের মাধ্যমে ফ্রিজ ঠান্ডা রাখে। আবার সেই কারেন্ট যখন কেটলিতে যায়, তখন পানি গরম হয়। একই বিদ্যুৎ ইলেকট্রিক ডিভাইসের কারণে কোথাও গরম, আবার কোথাও ঠান্ডা। আপনি ফ্রিজে হাত রাখলে হাত পুড়ে না। কিন্তু গরম কেটলিতে হাত রাখলে আপনার হাত পুড়ে যাবে।
একই বিদ্যুৎ, যা পাওয়ার হাউস থেকে সরবরাহ করা হয়, কিন্তু পরিবাহিতার বিশেষ্যতার কারণে এতে শীতলতা সৃষ্টি হয়। বস্তুত আল্লাহর দীপ্তিময় কিতাব ও ওহীর জ্ঞানের পরিধি এত তেজস্বী ও বিস্তৃত যে, সৃষ্টিকুলের তা সরাসরি গ্রহণ করার ক্ষমতা নেই। যখনই আল্লাহর সেই নূরের জ্যোতি নবীজির অন্তরের অন্তঃকরণের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করে এসেছে, তখনই আসমানী ওহীর তেজস্বিতা কমে তা মানবজাতির সহ্য করার মতো ভারসাম্যপূর্ণ নূর ও আলোর ন্যায় তৈরি হয়ে গেছে। ওহীর তেজস্বিতা কমিয়ে সৃষ্টিকুলের গ্রহণযোগ্য ও উপকারী শীতলতা এতে সৃষ্টি হয়ে গেছে।