ইতিহাস

আর্য অনার্য এবং গায়ের কালো রঙ

বিশ্বাসের দেয়াল এবং একটি হৃদয়ের আকুতি

আজ থেকে ৫০০০ বছর পূর্বে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে একটি জনবসতি ভারতে আসে। মৌসুমি আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে এই মাইগ্রেশনটা সম্পন্ন হয়। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে আগত সেই জনগোষ্ঠীটা আর কখনোই ভারতবাসীর মূল স্রোতে নিজেদেরকে মিশাতে পারে নাই। দুঃখজনক হলেও সত্য, উনাদেরকেই আমরা নমশূদ্র বা অচ্ছ্যুৎ হিসেবে পেয়েছি। সব সময় শহর থেকে দূরে, নদীর ঐ পারে যে ছোট ছোট গ্রাম আছে, যেখানে বিদ্যুৎ সুবিধা সবার শেষে পৌছাঁয়, সেখানেই তারা থাকে।

হিন্দু-মুসলিম প্রেম নিয়ে বর্তমানে অনেক কথাই হচ্ছে। আমাদের দেশে হিন্দু-মুসলিম প্রেম মানেই হল পাড়ার কোনো মুসলিম ছেলে কোনো প্রেয়সী হিন্দু রমণীর পাণি প্রার্থী হওয়া। কিন্তু আফ্রিকা মহাদেশ থেকে আগত যেই জনগোষ্ঠীটি আজও নিম্নবর্ণের হিন্দু হিসেবে নিজেদেরকে জীবনসংগ্রামে নিয়োজিত রেখেছে ; মুচি, কামার, কুমার, মেথর হিসাবে আমাদের সমাজের ভারসাম্য বজায় রাখছে, কখনোই দেখবেন না কোনো মুসলিম ছেলেকে ঐ অচ্ছ্যুৎ বা নমঃশূদ্র কোনো হিন্দু মেয়ের প্রেমে পড়তে। The Forgotten Genocide: How The Namasudras Were Betrayed Twice | Opinion News - News18এক কথায় যদি বলি এর উত্তর হল তাদের গায়ের রং কালো। হ্যাঁ, উচ্চবর্ণের হিন্দু মেয়েরা সুদর্শন বলেই তাদের প্রতি মুসলমান ছেলেরা এত আকৃষ্ট হয়।

আমার পিতা একজন সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। পিতার সরকারি চাকরির সুবাদে আমি বাংলাদেশের মোট ৮ টি জেলায় ছিলাম। নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা থানায় যখন ছিলাম, তখন আমাদের স্কুলের অরুণ স্যারের মেয়ে মনিকার প্রতি অনেক মুসলিম ছেলের দুর্বলতা আমি নিজ চোখে দেখেছি। উনারা সাহা গোত্রের ছিল। মনিকা সাহা। মনিকা নবম শ্রেণীতে পড়তো আর আমি ষষ্ঠ শ্রেণীতে। সাহারা হিন্দুদের মাঝে ব্যবসায়ী পরিবারের হয়। মনিকা দেবীর বাড়ির পাশে অনেককেই ঘুরঘুর করতে দেখতাম, মনিকাকে একটু একনজর দেখার জন্য।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমাদের সাথে শিল্পী রাণী চৌধুরী নামে এক মেয়ে পড়তো। মেয়েটার পরিবার মনে হয় কানুনগো পাড়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল, যারা ভূমি জরিপ করতো। আর হিন্দুদের মাঝে যারা চৌধুরী, তারাও তো উচ্চবর্ণের। সেই আমাদের ক্লাসের শিল্পীকে দেখতে অন্যান্য ডিপার্টমেন্ট থেকেও ছেলেরা আসত।

উচ্চবর্ণের হিন্দুরা নিজেদেরকে আর্য দাবি করে। জানিনা তাদের দাবিটা কতটুকু সত্য। তবে একসময় গ্রীকরা ভারতবর্ষ দখল করেছিল। এরপরে গ্রীকরা ভারতবর্ষে স্থায়ী হয়ে যায়। ধারণা করা হয়, আজকে যারা রাজপুত, তাদের আদি নিবাস গ্রীকে ছিল। জরাথ্রুস্টের সময়েও ইরান থেকে একটা মাইগ্রেশন ভারতে হয়েছিল। অনেক ইতিহাসবিদ তাদেরকেও আর্য বলে। হিন্দুরা যেহেতু জাতপাত খুব মেনে চলে, তাই ভিন্ন জাতের সাথে তাদের বিয়ে হয় না বললেই চলে। তাই ঘুরায় ফিরাইয়া সেই জিনগুলো তাদের মাঝেই থাকে।

অনেক এলেবেলে হিন্দু ছেলে খুব চমৎকার মেয়ে পায় শুধু জাতের জোরে। আমার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে। আমি জেল থেকে বের হয়ে এখন সেখানেই থাকি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে প্রচুর হিন্দু, তবে অনেক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হিন্দু মূল শহরের বাইরে, তিতাস পাড়ের ওপারে থাকে। তারা সকালে শহরে এসে কাজ করে চলে যায়। রাতে শহরের বাইরে নদীর পাড়ে তাদের বাড়িতে থাকে।

রাজা লক্ষ্মণ সেন মূল ভারত থেকে উচ্চবর্ণের অনেক ব্রাহ্মণকে পাঠিয়েছিলেন এই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে পূজা-আর্চনা করার জন্য। আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে তাদের কিছু বংশধরকে পেয়েছি খুবই উচ্চবর্ণের। বিশেষ করে রায় পরিবারের এক কন্যাকে দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। সৌন্দর্যের একটা অংশ তাকে দান করা হয়েছে। ধরেন, তার নাম পারমিতা রায়।

আমি এখানে Racism চর্চা করতে আসি নাই আর দৈহিক সৌন্দর্য দিয়ে কাউকে বিচার করাও ঠিক না। আবার, হিন্দু সম্প্রদায়ের এই অভিযোগটাও সত্য — ” তাদের সম্প্রদায়ের সুদর্শন কন্যাদেরকে তাদের জাতে রাখতে তাদেরকে খুব কষ্ট করতে হয়। ” হিন্দুদের অভিযোগ, মুসলমান ছেলেরা তাদের সুদর্শন মেয়েদেরকে খুবই বিরক্ত করে।

ধী || দৃষ্টিপ্রদীপ

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের *দৃষ্টি প্রদীপ* উপন্যাসের বৈষ্ণব কন্যা মালতীকে পড়ে আমি যে রকম মুগ্ধ হয়েছিলাম, পারমিতা রায়কে দেখে আমি তার চেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছি। তবে পারমিতাদের সাথে দেরি তে সাক্ষাৎ হয়। এই কথাগুলো আমি এই জন্যই বললাম—আমার পরিচিত প্রচুর সংখ্যক হিন্দু ছেলে সারাদিন অনলাইনে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে খিস্তি-খেউড় করে বেড়ায়। তাদের উচিত অনলাইনে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে সময় নষ্ট না করে পারমিতা, মনিকা, শিল্পীদের পেছনে ঘোরা। এর দ্বারা এরা আখিরাতের জীবনে কিছু না পেলেও, দুনিয়ার জীবনে অন্তত মনিকাকে পেল। বৈষ্ণব কন্যা মালতী কে তো আমি দেখি নাই কিন্তু পারমিতা রায় কে আমি দেখেছি। এই ধরিত্রীর বুকে অথবা অন্য মহাকাশে অন্তত একটা জীবন যেন আমি পারমিতার সাথে থাকতে পারি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button