নজরুল, শ্যামা সঙ্গীত এবং অতঃপর

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে আমার লেখার অনেক ইচ্ছা ছিল। নজরুল যেমন আমাদের আবেগের জায়গা, ঠিক তেমনি নজরুল আমাদের মুসলিম সমাজের জন্য একটি লজ্জাও। নজরুল হিন্দু মেয়ে বিয়ে করেছিলে, সেটা আমরা সবাই জানি। নজরুলের স্ত্রী প্রমীলা দেবী, নজরুলের এক ছেলের নাম ছিল কৃষ্ণ মোহাম্মদ ! কি আজিব ! নজরুলের শাশুড়ি গিরিবালা দেবী, নজরুলের বাড়িতেই থাকতেন, নিয়মিত উলুধ্বনি দিয়ে পূজা-প্রার্থনা করতেন; এগুলো আমরা সবাই জানি।
হিন্দু মুসলিম প্রেম আমাদের সমাজে নতুন কিছু না। এগুলো আমাদের সমাজে প্রায়ই ঘটে। তবে নৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে হিন্দু রমনী বিয়ে করা ঠিক না। কারণ হিন্দু মেয়েরা বহুগামী হয়, তারা এক পুরুষে সন্তুষ্ট থাকে না।
নজরুলের এই হিন্দু মেয়ে বিয়ে করা সেই সময়ের মুসলিম সমাজ একপ্রকার মেনেই নিয়েছিল। কিন্তু নজরুলকে কাফের ফতোয়া দেওয়া হয়েছিল হিন্দু রমনী বিয়ে করার কারণে নয়। সেটা ছিল নজরুলের লেখা মা কালী, শ্যামা কে নিয়ে ভজন সঙ্গীত রচনা করার জন্য। সাহিত্যের ভাষায় যেটাকে শ্যামাসংগীত বলা হয়। শ্যাম অর্থ কালো, শ্যামা দ্বারা সেই কালো মেয়ে হিন্দুদের মা কালিকে বোঝানো হয়েছে।
এক কালো কুৎসিত জিহ্বার অধিকারী মহিলাই আজ ঈশ্বরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। নজরুল কালীকে মাতৃরূপে কল্পনা করেছেন, ২৪৭টির মতো শ্যামাসংগীত রচনা করেছেন, ভাবাবেগের সহিত নিজে তা গেয়ে সবাইকে শুনিয়েছেনও। বিশিষ্ট কালীসাধক বামাক্ষ্যাপার কাছেও নজরুল নিয়মিত যেতেন। নজরুল যে শুধু শ্যামাসংগীত রচনা করেছেন তাই নয়, উনি পরবর্তীতে কালীসাধনাও শুরু করেছিলেন। সেই কালীমূর্তির সামনে বিশেষ ভঙ্গিতে বসে থাকতে থাকতে নজরুল মানসিক বৈকল্যের শিকার হন, যেটাকে আমরা ডাক্তারের ভাষায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত বলি।
‘রাঙা জবা’ শ্যামাসঙ্গীতের একটি বিশেষ সংকলন, যেখানে মা কালিকে নিয়ে লেখা নজরুলের সব শ্যামাসঙ্গীত পাওয়া যায়। নজরুলের শ্যামাসঙ্গীতগুলো আমরা একটু পড়ার চেষ্টা করি—
১. শ্মশানে জাগিছে শ্যামা [রাঙা জবা ৫৭],
২. যে কালীর চরণ পায় রে [রাঙা জবা ৯১],
৩. নাচরে মোর কালো মেয়ে [রাঙা জবা ১৫],
৪. কালী সাধনা মন্ত্র জপি [রাঙা জবা ৪৩],
৫. আমার শ্যামা মায়ের রূপ দেখে মহাদেব হলো পাগল।
এই ‘রাঙা জবা’ পড়তে গিয়ে আমার গা শিরশির করে উঠছে। একটা লোক কত নীচে নামলে কিছু হিন্দু প্রকাশক, কিছু হিন্দু ক্যাসেট কোম্পানির মালিক, কিছু হিন্দু রাজনৈতিক নেতাদের খুশি করার জন্য নিজের সেই মেধা, শ্রবণশক্তি এক কালো, কুৎসিত জিহ্বার অধিকারিণীর পিছে ব্যয় করে ! লজ্জা থাকলে আমাদের এখন মইরা যাওয়া উচিত।

তবে শুধু শ্যামাসঙ্গীত লিখেও নজরুল হিন্দুদের মন পায়নি। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক গোলাম আহমেদ মূর্তজা তাঁর ‘চেপে রাখা ইতিহাস’ বইতে নজরুল অধ্যায়ে লিখেছেন— ” নজরুলের শ্যামাসংগীত লেখার পর হিন্দুরা বলা শুরু করল, লেখা এবং ব্যক্তি এক হতে পারে না; নজরুল এখনো সাম্প্রদায়িক রয়ে গেছে, নজরুলকে আরও অসাম্প্রদায়িক হতে হবে।
পরবর্তীতে হিন্দুদের কথায় নজরুল আরও অসাম্প্রদায়িক হতে গিয়ে কালীসাধনা শুরু করেন, এবং কালীসাধনা করতে করতে তিনি চূড়ান্তভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যান। ” মা কালীর মুখের দিকে তাকিয়ে নজরুলের ২৪৭টি শ্যামাসংগীত লেখার প্রাপ্তি হল নজরুলের বাকি ৪০ বছরের জীবন; মানুষের মুখের দিকে অসহায়ের মত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েই কাটাতে হয়েছে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর উত্তর প্রদেশের শিক্ষিত মুসলমানরাই পাকিস্তানের হর্তাকর্তা হয়। উত্তর প্রদেশের শিক্ষিত মুসলমানরা সাহিত্য রুচিবোধ সম্পন্ন ছিলেন। ভারতের উত্তরপ্রদেশে বহু সংখ্যক কবি-সাহিত্যিকের আগমন ঘটেছে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান উত্তরপ্রদেশের আমলাদের চাপেই পাকিস্তানের অনেক সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তন করেন। যেমন আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, প্রাইড অফ পারফরম্যান্স প্রেসিডেন্ট পুরস্কার, দাউদ পুরস্কার। প্রত্যেকটি পুরস্কারের অর্থমূল্য ছিল ৫–১০ হাজার টাকা, যা সেই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। আইয়ুব খানের সময় চালের মন ছিল ৩০ টাকা, ১ ভরি সোনার দাম ছিল ১২০ টাকা। তাই তখনকার ক্ষেত্রে ৫-১০ হাজার টাকা যে অনেক বেশী সেটা বুঝাই যাচ্ছে। কোনো কবি সাহিত্যিক একটি জাতীয় পুরস্কার পেলেই ঢাকা শহরে জমি কিনে বাড়ি বানিয়ে ফেলতে পারত।
নজরুল তার কবিতায় প্রচুর উর্দু-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন। উসমানীয় খেলাফতের পক্ষে কবিতা ও গান লিখেছেন। তাই স্বাভাবিক ভাবেই নতুন পাকিস্তানের উত্তর প্রদেশ ভিত্তিক আমলাদের কাছে নজরুল কোনো অপরিচিত ব্যক্তি ছিল না। যেখানে মহাত্মা গান্ধী নজরুলকে চিনতেন, সেইখানে উত্তর প্রদেশের আমলারা নজরুলকে চিনবে না সেটা হতে পারে না।
তো সেই পাকিস্তান ভিত্তিক উত্তর প্রদেশের আমলারা নজরুলকে কী সম্মানী দিয়েছে? প্রতি মাসে মাত্র ২০০ টাকা ভাতা তাও ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় সেই ভাতা অনেকদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
নজরুলের অসুস্থতা ধরা পড়ার পর অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক। সেই এ. কে. ফজলুল হক নজরুলের প্রতি কোনো বিশেষ সহানুভূতি দেখাননি। নজরুল-ভক্তরা তার কাছে বারবার যাওয়ার ফলে তিনি পুরো ব্যাপারটি তার মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের উপর অর্পণ করেন।
নজরুলকে নিয়ে অনেক সময় অনেক মুসলিম দেশ আগ্রহ দেখিয়েছিল, যেমন— ইরান, তুরস্ক প্রভৃতি। কিন্তু কোনো এক রহস্যজনক কারণে নজরুলের প্রতি তাদের সেই আকর্ষণ আর বেশী দিন থাকে না। নজরুলের আন্তর্জাতিকরন হয়েছে খুবই কম। এমনকি নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির আজ পর্যন্ত একটি ভালো ইংরেজি অনুবাদ হয়নি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে যেমন ভারত সরকার আত্মীকরণ করেছিল, নজরুলকে তেমন কেউ আত্মীকরণ করেনি। অন্তত মুসলিম বিশ্বেও যদি নজরুল পরিচিতি লাভ করতেন, তাও ভালো লাগত। নজরুলের এই আন্তর্জাতিকরণের না হওয়ার মূল কারণ হলো এই শ্যামাসংগীত। নজরুলকে নিয়ে কোন ভিনদেশী মুসলিম যখন গবেষণা শুরু করে, তখনই নজরুলের এই হিন্দু-প্রীতি ও শ্যামাসংগীতের কথাও সামনে আসে। তখন অনুবাদকদের ভিতরে এক বিবমিষার উদ্রেক হয়। একজন মুসলিম সাহিত্যিক প্যাগানদের দেব-দেবীদের নিয়ে ভজন-সংগীত গাইবেন, সেটা কারো কল্পনাতেও আসে না।
নজরুল যদি নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতেন, হিন্দুদের সাময়িক অনুকূল্য পাওয়ার জন্য এসব ভজন সংগীত না লিখতেন, তাহলে মুসলিম সম্প্রদায় তাকে মাথার মণি করে রাখত। কিন্তু নজরুল সাময়িক লোকের বশবর্তী হয়ে নিজের স্বাতন্ত্র্য হারিয়েছেন। নজরুলের এই স্বাতন্ত্র্য হারানোর খেসারত উনি দিয়েছেন যখন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন নজরুলের অবস্থা এ রকম – ” হিন্দুদের কাছে মুসলমান, আর মুসলমানদের কাছে কাফের। ”
নজরুল অসুস্থ হওয়ার পাঁচ বছর পরই পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। নজরুল যদি দেব-দেবীদের কে নিয়ে এইসব ভজনসঙ্গীত ও শ্যামাসংগীত না লিখতেন, তাহলে হয়তো তৎকালীন পাকিস্তান সরকার উনাকে পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে আসতেন, নজরুলের লেখাগুলো আরবি, ফারসি ও উর্দুতে অনুবাদ করে নজরুল কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি করানো হত।
হায়! নজরুল যদি বুঝতে পারতেন ভবিষ্যতে পাকিস্তান রাষ্ট্র হবে, মধ্যপ্রাচ্য পেট্রো-ডলারে ফুলে-ফেঁপে উঠবে, তাহলে হয়তো তিনি সাময়িক লোভের বশবর্তী হয়ে এসব দেবী-ভজন সংগীত লিখতেন না। নজরুল কোনো বাছ বিচার না করেই নগদে যা আছে, তা হাত পেতে নিয়েছেন। সেই জন্যই ভবিষ্যৎ মুসলিম রাষ্ট্র উনার কপালে জোটে নাই।
অনেকেই বলে থাকেন, নজরুল তার শাশুড়ি গিরিবালা দেবীকে খুশি করার জন্যই এইসব উদ্ভট দেবী-ভজন সংগীত লিখেছিলেন, আমার মতে এটা একটা ভুল ধারণা। নজরুলের মতো ব্যক্তি কখনো কোনো নারীকে খুশি করার জন্য ২৪৭টি শ্যামাসংগীত লিখবেন না। আর নজরুল তো প্রথাগতভাবেই শাক্ত হয়েছিলেন। প্রখ্যাত তান্ত্রিক সাধক বামাক্ষ্যাপা বা বামাচরণ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে নজরুল নিয়মিত যেতেন। 
মূলত ওই সময় কলকাতা কেন্দ্রিক একটা এলিট শ্রেণী ছিল, যারা সবাই ছিল কট্টর হিন্দু, তাদেরকে খুশি করার জন্যই নজরুলের এই শ্যামা সাধক হয়ে ওঠা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা আমাদের সবাইকে এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার লোভ থেকে বাচিঁয়ে রাখুক, আমীন।