সকল দোয়া একসাথে কবুল হয় না কেন ?


আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা তার কাজের ব্যাপারে নিজ ইচ্ছাধীন। উনি যা চান তাই হবে, কেউ চাপ প্রয়োগ করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালাকে কোন কাজ করতে বাধ্য করতে পারবে না, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা উনার রহমত ও কঠোরতার মাধ্যমেই উনার সব কাজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন। বদর যুদ্ধের সময় যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুঝতে পেরেছিলেন এই স্বল্প সংখ্যক মুসলিম কাফেরদের বিপুল সংখ্যাধিক্যের কাছে কিছুই না, এই একতরফা যুদ্ধে মুসলমানরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।তখনই আল্লাহর রাসুলের ঐকান্তিক দোয়ার কারণেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা বদর যুদ্ধে মুসলমানদের সাহায্য করার জন্য ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন। ফেরেশতারা আসার পর যুদ্ধের মোড় পরিবর্তন ঘটে, ৭০ জনের মত কাফের নিহত হয় এবং মুসলমানরা বদর যুদ্ধে বিজয়ী হয়। ফেরেশতারা কিন্তু চাইলেই পারতেন বদর যুদ্ধে যত কাফের সৈন্য আছে এদের সবাইকে একসাথে হত্যা করে ফেলতে, এটা ফেরেশতাদের জন্য কোন কঠিন কিছু ছিল না। বদর যুদ্ধে অবস্থানরত সকল কাফের সৈন্য ফেরেশতা কর্তৃক নিহত হলে ওহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের এই পরাজয়ের সম্মুখীন হতে হতো না, মুসলমানরা মক্কা জয়ের পথে অগ্রগামী হতে পারত, বদর যুদ্ধে সকল কাফের সৈন্য ফেরেশতাগণ কর্তৃক একযোগে নিহত হলে পরবর্তীতে ওহুদ খন্দকের যুদ্ধ হতো কিনা সন্দেহ।
কিন্তু এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালার রীতি না উনি একচেটিয়া ভাবে শুধু মুসলমানদেরকেই বিজয়ী করবেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা মুসলমানদের কাছ থেকে ঈমানের পরীক্ষা নিতে চান। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা দেখতে চান ঈমানের পরীক্ষায় মুসলমানরা কতটুকু দৃঢ় পদ। ধৈর্যের পরীক্ষায় মুসলমানরা কতটুকু সহিষ্ণুতার পরিচয় দেয়, এই পৃথিবীতে যদি বিধর্মী নাই থাকে তাহলে মুসলমানরা ঈমানের পরীক্ষা কিভাবে দিবে? জিহাদের ময়দানই বা কিভাবে চালু থাকবে? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা যখন কাউকে জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা দিতে চান কিন্তু বান্দার আমল যখন এই উচ্চ মর্যাদা পাওয়ার উপযুক্ত থাকে না তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা ওই বান্দাকে বিভিন্ন পরীক্ষার সম্মুখীন করেন, বান্দা ওই পরীক্ষা কৃতকার্য হলে বান্দার আমল জান্নাতের সেই উচ্চ মর্যাদা পাওয়ার উপযুক্ত না হলেও বান্দা যেহেতু দুনিয়ার জীবনে এই পরিমাণ দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছে তাই এর উসিলায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা বান্দাকে জান্নাতের সেই উচ্চ মর্যাদা দান করেন।
এর দ্বারা বোঝা যাচ্ছে ফ্যাসিজম, কমিউনিজম, কলোনিয়ালিজমের উপস্থিতির কারনে মুসলমানরা যেমন অনেক অত্যাচার নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছে, আবার তাদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার মুসলমানরা জান্নাতের অনেক উচ্চ মর্যাদাও হাসিল করেছে।
একটা মশার আয়ুস্কাল মাত্র ১৪ দিন, মানুষের কাছে এই ১৪ দিন কিছুই না কিন্তু মশার কাছে তা অনেক। ঠিক তেমনি মানুষের এই ৬০-৭০ বছর আয়ু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার অনন্ত অসীম সময়কালের মাঝে মুহূর্তের মর্যাদাও পাবে না। তাই স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের এই ৬০-৭০ বছর জীবনকালটাকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা মানুষকে একটা পরীক্ষার মাঝেই অতিবাহিত করাবেন এটা বুঝাই যাচ্ছে। দুনিয়ার জীবনে একাডেমিক ভালো ফলাফল করা যেমন কষ্ট ঠিক তেমনি জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা পেতে হলে দুনিয়ায় অবশ্যই পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। আর এই কথাটা আল-কোরআনে আগেই বলে দেওয়া হয়েছে – ” নিঃসন্দেহে আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি, কষ্ট-ক্লেশের মধ্যে ” [ সূরা বালাদ, আয়াত: ৪ ]
বদর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব ব্যাকুলতার সহিত আল্লাহ সুবহানু ওয়াতায়ালার কাছে বারবার দোয়া করছিলেন যেন কাফেরদের সংখ্যাধিক্যের কারনে মুসলমানরা পরাজিত না হয়। সেই সময় হযরত আবুবকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বারবার নবীজীকে সান্তনা দিচ্ছিলেন যে আপনি এত ব্যাকুল হবেন না। আল্লাহ সুবহানুওয়া তায়ালা অবশ্যই মুসলমানদেরকে সাহায্য করবেন। কিন্তু হযরত আবুবকর রাযিয়াল্লাহ আনহুর কথার আল্লাহর রাসুল আল্লাহর কাছে দোয়া করা বন্ধ করেন নি। দোয়াতে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বারবার এই কথাটাই বলেছিলেন – “এই ক্ষুদ্র জামাতটা যদি আজকে পরাজিত হয় তাহলে এই পৃথিবীর বুকে তোমার ইবাদত করার মত আর কেউ থাকবে না”। আমাদের নবীজির বারবার এই কথাটা বলার কারণ হলো- এই পৃথিবীর ইতিহাসে বহু নবী-রাসূল এসেছিলেন, উনারা খুব অল্পই অনুসারী তৈরি করতে পেরেছিলেন, বেশিরভাগ নবী রাসুল তৎকালীন রাজা বাদশা কর্তৃক বা যাদের কাছে উনারা এসেছেন সেই সকল কাফের কর্তৃক শহীদ হয়ে গিয়েছিলেন। নবী রাসুলরা শহীদ হয়ে যাওয়ার পরে উনার অনুসারী মুসলমানরাও ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তাওহীদের দাওয়াত এমনভাবে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল যে ঐ এলাকায় কোন নবী রাসুল এসেছিল এর কোন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও খুঁজে পাওয়া যায় না।
আল্লাহর রাসূল আসার পূর্বে সারা পৃথিবীতে প্যাগানিজমই একচেটিয়া ভাবে রাজত্ব করেছে। এখন আল্লাহর রাসূলের ভয় ছিল এটাই যে পূর্বের যে সকল নবী রাসূলের উম্মত ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে এখন গতানুগতিক যুদ্ধ শুরু হলে তো এই বদরের প্রান্তেই স্বল্প সংখ্যক মুসলমানের ভূগর্ভস্থ সমাধি হবে।
আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তায়ালা আমাদের ইবাদতের মুখাপেক্ষী নন। সারা পৃথিবীর সবাই যদি কাফেরও হয়ে যায় এতে আল্লাহ সুবহানু ওয়াতায়ালার কোন যায় আসবে না। মানুষ তার নিজের আখেরাতের জীবনকে নিরাপদ রাখতেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালার ইবাদত করতে বাধ্য। আল্লাহ সুবহানু ওয়াতায়ালার একটি নাম হচ্ছে *আস সামাদ অর্থাৎ অমুখাপেক্ষী* উনি কারো এবাদতের মুখাপেক্ষী নন, বদর যুদ্ধে সকল মুসলমান যদি শহীদ হয়ে যেত এতে আল্লাহ সুবহানু ওয়াতায়ালার বড়ত্ব ও মহত্ত্বের কোন কমতি হতো না। আল্লাহ সুবাহানু ওয়া তাআলার সিফাত সম্পর্কে নবীজির যে জ্ঞান ছিল সাহাবী হযরত আবু বকরের এই জ্ঞান ছিল না। এজন্যই হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এক প্রকার নিশ্চিত ছিলেন যে আল্লাহর সাহায্য আসবেই, কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভালোভাবেই জানতেন বদর যুদ্ধে মুসলমানদেরকে সাহায্য করার জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা বাধ্য ছিলেন না। আল্লাহকে কেউ চাপ প্রয়োগ করে কিছু করাতে পারবে না।
এই পৃথিবীর ইতিহাসে যেইরকম ভাবে বহু নবী রাসুলের অনুসারীরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল, সেই সময় আল্লাহর সাহায্য আসেনি ঠিক সেইরকম ভাবেই আমাদের নবীজি ভয় পাচ্ছিলেন এই বদর যুদ্ধে মুসলমানরা পরাজিত হয়ে গেলেও এতে আল্লাহ সুবহানু ওয়া তায়ালার বড়ত্ব ও মহত্ত্বের কোন কমতি হবে না। আল্লাহর রাসূলের ঈমান ছিলেন হাক্কুল ইয়াক্বিনের পর্যায়ে, প্রত্যক্ষ বিশ্বাসের জায়গায় কিন্তু সাহাবী হযরত আবু বকর এর ঈমান ছিলেন ইলমুল ইয়াক্বিন জ্ঞানগত বিশ্বাসের পর্যায়ে। এইজন্য নবীজি বদর যুদ্ধের পূর্বে অতিশয় কাতর হলেও সাহাবী আবু বকর এর মাঝে এই কাতরতাটা ছিল না।
[ তথ্যসূত্র: ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহির কিমিয়ায়ে সাআদাত, সৌভাগ্যের পরশমণি বইয়ের ৪র্থ খন্ড থেকে আমি এই লেখার রিসোর্সটা পেয়েছি। আমার এরকম আরো লেখা আপনারা আমার সদ্য প্রকাশিত “ফারাবী রচনা সমগ্র” বইতে পাবেন। ]

ভাল আকিদা শিখলাম।
বিশুদ্ধ আকিদা শিখলাম
একজন কয়েদিও ভাত খায় আবার দেশের রাষ্ট্রপতিও ভাত খায়। কিন্তু ২ জনের ভাত খাওয়ার মাঝে কত আকাশ-পাতাল পার্থক্য! ঠিক তেমনি জান্নাতবাসীদের মাঝেও মর্যাদার আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকবে। এটা খোদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও বলেছেন। – “জান্নাতবাসীরা তাদের উপরের বালাখানার বাসিন্দাদের এমনভাবে দেখতে পাবে, যেমন তোমরা আকাশের পূর্ব অথবা পশ্চিম দিকে উজ্জ্বল দেদীপ্যমান নক্ষত্র দেখতে পাও। এটা হবে তাদের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্যের কারণে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩০৮৩]