ইতিহাস

নিরাকার ঈশ্বর না সাকার ঈশ্বর ?

মূর্তিপূজার উদ্ভব কিভাবে হল ?

এই কথাতে তো আমরা সবাই একমত যে, জনসাধারণের প্রবৃত্তি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের প্রতিই বেশি আকৃষ্ট হয়ে থাকে, আর বিমূর্ত চিন্তনের প্রতি তার ঘোর অরুচি পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। নিরাকার ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস কেবল সুশিক্ষিত মানুষেরাই অনুভব করতে পারে। যদিও সকল দেশে আর সকল কালে তাদের সংখ্যা খুবই কম হয়ে থাকে। আর যেহেতু জনসাধারণ মূর্ত ও সাকার রূপকেই ঈশ্বরের রূপ হিসেবে মৌনভাবে স্বীকার করে নেয়, সেহেতু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অগণিত নেতা আজও অব্ধি অজ্ঞ নিরীহ জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করে চলছে।

 

অন্ধ জনসাধারণকে সম্মোহিত করার জন্য তাদের ধর্মীয় নেতারা তাদের ধর্মীয় বই-পুস্তকে এবং উপাসনাগৃহগুলোতে এই ধরনের সাকার মূর্তি স্থাপন করেই চলছে। আর মূর্খ জনগনই এইসব কাল্পনিক ঈশ্বরের মাঝে বুঁদ হয়ে পরে আছে।

This may contain: the virgin mary holding a heart surrounded by stained glass mosaics and gold leaf accents

প্যাগানরা তো এই কাজটা ভালোভাবেই করে, আর প্যাগানদের এই বদভ্যাসটা খ্রিস্টানরাও বেশ ভালোভাবে রপ্ত করে ফেলেছে। আপনি গির্জায় প্রবেশ করলেই যীশু, মেরি ও সেন্ট পলের অনেক মূর্তি এবং তাদের কাল্পনিক ছবি দেখতে পাবেন। হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের শিক্ষা সেন্ট পলের মূর্তিপূজাতেই সমর্পিত হলো।

 

ব্যাপারটা একটু সহজভাবে বুঝিয়ে বলি। কাবাঘর আমাদের সবার কাছেই একটি সম্মানের বিষয়। কাবাঘর দর্শন করার ইচ্ছা প্রত্যেক মুসলমানের হৃদয়েই আছে। এখন কাবাঘরের ছবি যদি কোথাও টাঙিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তার প্রতি সবাই আকৃষ্ট হবে। সেই ছবিতে সবাই চুমু খাবে। মনে হবে যে, তারা কোনো ছবি দেখছে না, খোদ কাবাঘরকেই দর্শন করছে। যদিও কাবাঘর কোনো ঈশ্বরের প্রতিকৃতি নয়, তারপরও কাবার ছবির প্রতি মানুষের এই মুগ্ধতা আমাদের অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়।

 

মানুষ সাধারণত যা চোখে দেখে না, সেটার প্রতি তার কোনো দুর্বলতা আসে না। আর ভক্তি তো অনেক পরের ব্যাপার। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম— ” যা দেখি নাই দুই নয়নে, তা বিশ্বাস করি না গুরুর বচনে। ”

This may contain: the hindu deities and their names in different poses, with pictures of them on each side

দৃশ্যমান ঈশ্বরের প্রতি জনসাধারণের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই মন্দিরের পুরোহিতরা সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করার প্রয়াস চালায়। কল্পিত ঈশ্বরের চিত্র ও স্মৃতিচিহ্নগুলোকে সম্মান করাটা তাদের ধর্মের বিশ্বাসের অংশ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে মূর্তিপূজা নিম্নবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের মাঝেই সীমাবদ্ধ। যারা মুক্তিপথের পথিক, যারা দর্শনশাস্ত্র ও ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করে, এবং যারা বিমূর্ত সত্যকে লাভ করতে ইচ্ছুক, তারা এক ঈশ্বর ছাড়া আর কারও উপাসনা করে না। আর তারা ঐ ঈশ্বরকে মূর্তিরূপে প্রতিষ্ঠা করে, তার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার কথা কল্পনাও করতে পারে না। এইভাবে আদিকাল থেকেই মন্দিরের পুরোহিতরা নিম্নবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদেরকে বোকা বানিয়ে আসছে।

 

মুসলমানরা প্রথম ভারতে আসে মূলত ব্যবসায়িক উদ্দ্যেশ্যে। এক গোধূলি লগ্নে মাগরিবের সন্ধ্যায় এক আরব বণিকের সুললিত কণ্ঠে সালাত আদায়ের সময়ে হিন্দু বাজারবাসী সব থমকে দাঁড়ায়। বাজারবাসী বণিকের সালাতের ওঠাবসা খুব মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করে। কিন্তু তারা অবাক হয়ে দেখে বণিকের প্রার্থনা শোনার জন্য সামনে কোনো মূর্তি নেই। মূর্তিবিহীন ঈশ্বর/দেবতাবিহীন ঈশ্বর ! এও কি সম্ভব ? নিরাকার ঈশ্বরের প্রার্থনা করা কি সম্ভব ? এই মুসলিম বণিক তাহলে কার প্রার্থনা করে ?

 

জাহেলিয়াত মানুষের মন মানসিকতাকে এত তীব্রভাবে গ্রাস করেছিল যে, ঈশ্বরের মূর্তিবিহীন কোনো ধর্মীয় প্রার্থনাকে মানুষ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখত। মূর্তি এবং ঈশ্বর, এই ২ টি শব্দ যেন সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছিল। মুনি ঋষিরা ঈশ্বরকে দেবতার আসনে নামিয়ে এনেছিল, আর মানুষ সেই দেবতার মূর্তির পায়ে নিজের মাথা ঠেকিয়ে মানবতার চূড়ান্ত অপমান করেছিল। যদিও মানবজাতির প্রথম পূজ্য ছিল বড় বড় বৃক্ষ। এরপর যখন মানুষের একটু বুদ্ধিশুদ্ধি হয় তখন সে রঙবেরঙের মূর্তি বানিয়ে পূজা শুরু করে।  পৌত্তলিক ধর্ম হিন্দু, বৌদ্ধ যেটাই বলি না কেন ; এগুলো আসলে মানবতার অপমান বৈ ছাড়া আর কিছু নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button