আক্বীদা

মুতাজিলা ; বিশ্বাসের বিবর্তন এবং আধুনিক বিজ্ঞান

মুতাজিলারা হাদীসের উপর যুক্তিকে প্রাধান্য দিত। তারা প্রথমে যুক্তি দিয়ে হাদিসটা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতো ঐ হাদিসটা মানা যাবে কিনা। যদি তাদের মানবিক যুক্তির মাঝে হাদিসটা ধরা দিত, তাহলে তারা ঐ হাদিসটাকে মানতো।

 

মুতাজিলারা হাশরের ময়দানে মিজান/দাঁড়িপাল্লার মাধ্যমে নেকি-গুনাহর যে ওজন পরিমাপ করা হবে, সেটা মানত না। মুতাজিলারা বলতো – ” পাপ-পুণ্য তো চোখে দেখা যায় না, দৃশ্যমান নয়; তাহলে এটার আবার ওজন হবে কিভাবে ? ”

 

নেকি-গুনাহ এই ২টা জিনিস চোখে দেখা না গেলেও কোনটা সৎকাজ আর কোনটা অসৎ কাজ সেই ব্যাপারে তো আমরা সবাই একমত। মহাকর্ষ, অভিকর্ষ এই বলগুলোও তো চোখে দেখা যায় না; কিন্তু মহাকর্ষীয় ধ্রুবক G এর মান সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। শুধু তাই নয়, মহাকর্ষীয় বিভবকেও পরিমাপ করা যায়।

 

মহাকর্ষ, অভিকর্ষের উপস্থিতি সম্পর্কে এখন আমাদের কারো মাঝে আর কোন আপত্তি নাই। আপনি যদি একজন লোককে ঘুষি মারেন, তাহলে সেই ঘুষিটায় কী পরিমাণ নিউটন N বল শক্তি কাজ করেছে, সেটা কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এখন বলে দিতে পারে।

কারেন্ট বা বিদ্যুৎ প্রবাহ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়, কিন্তু কারেন্টের ধরন বোঝার জন্য কত পদ্ধতিই না আজ আবিষ্কার হয়েছে—ভোল্ট (V), ওহম (Ω) অ্যাম্পিয়ার (A), কুলম্ব (C) প্রভৃতি। বিদ্যুতের চেয়েও সূক্ষ্ম আলো পরিমাপের জন্যও তো আজ আধুনিক বিজ্ঞান লাক্স (lux 1x), লুমেন (lumen 1m), ক্যান্ডেলা (candela cd), রেডিয়ান (radian rad θ), স্টেরেডিয়ান (steradian sr Ω) কত এককই না আবিষ্কার করেছে!

 

আজ থেকে ১০০ বছর আগেও তো মানুষের জুল (j), ওয়াট (W), প্যাসকেল ( Pa) এইসব প্রতীক সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে আজ আমরা জুল (j) দ্বারা কাজের পরিমাপও যেমন করতে পারি, আবার শক্তির পরিমাপও করতে পারি—যেটাকে শুদ্ধ বিজ্ঞানের ভাষায় N·m বলা হয়।

আপনি সারাদিন কতটুকু কাজ করেছেন, আপনার শরীর থেকে কতটুকু শক্তি ক্ষয় হয়েছে তা আমরা এখন ক্যালোরি (cal) প্রতীকের মাধ্যমে জানতে পারি।

Diagram of the electromagnetic spectrum

 

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের কল্যাণ আমরা এখন সবাই জানি আলো এক ধরনের তড়িৎ চৌম্বক বিকিরণ Electromagnetic Radiation ছাড়া আর কিছুই নয়। তড়িৎ চৌম্বক বিকরণের অনেকগুলো রকমভেদ আছে। এর মাঝে আমরা শুধু দৃশ্যমান আলো টাই দেখতে পাই। অবলোহিত তরঙ্গ (infrared wave), অতি বেগুনি বিকিরণ (ultraviolet radiation) এই সকল তড়িৎ চৌম্বক বিকরণ আশরাফুল মাখলুকাত হওয়া সত্ত্বেও আমাদের চোখে ধরা দেয় না। কিন্তু অজগর জাতীয় সাপ অবলোহিত তরঙ্গ গুলো খুব ভালো দেখতে পায়। মৌমাছি, টিয়া পাখি, ঈগলের চোখে অতি বেগুনি বিকিরণ গুলো ঠিকই ধরা খায়। ফলশ্রুতিতে মানুষের দৃষ্টি শক্তির চেয়ে অজগর জাতীয় সাপ, মৌমাছি এবং অনেক পাখির দৃষ্টিশক্তি যে অনেক উচ্চ এতে আর কোন সন্দেহ নাই। তাই বিজ্ঞানের ভাষায়ই বলা যায় ফেরেশতাদের দেখার জন্য যে তড়িৎ চৌম্বক বিকিরণের উদ্ভব ঘটাতে হবে সেটা হয়ত মানুষ কোনদিনও আবিষ্কার করতে পারবে না। আর সেইজন্যই হয়ত জ্বীন ফেরেশতা এদেরকে চর্মচক্ষে দেখা যায় না।

 

বিজ্ঞান নিয়ে এত কচকচানি এইজন্যই করলাম এই পৃথিবীতে পাপ-পুণ্যের ওজন পরিমাপ করার জন্য কোনো প্রতীক না থাকলেও ফেরেশতাদের জন্য এগুলো পরিমাপ করা অসম্ভব কিছু না। সীমাবদ্ধ জ্ঞান থাকা স্বত্ত্বেও মানুষ আজ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয় এমন সব শক্তি, পদার্থ, ক্ষমতার সূক্ষাতিসূক্ষ্ণ পরিমাপ করতে পারে।

 

আকাশে সূর্য, চন্দ্র উঠা নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। কারন চন্দ্র, সূর্য কে সবাই খালি চোখে দেখতে পারে। এই পৃথিবীর সব তর্কবিতর্ক এই আখিরাতের উপর বিশ্বাস আনা নিয়েই। এখন জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা, দোযখ এগুলো যদি মানুষ খালি চোখে দেখতে পারত তাহলে তো আর আখিরাতের বিশ্বাস নিয়ে কারো মাঝে কোন তর্কবিতর্ক থাকত না। সবাই আখেরাতের উপর বিনা প্রশ্নে ঈমান আনত।

কিন্তু তখন তো আর গায়েবের উপর ঈমান আনার বিষয়টা থাকত না। সারা পৃথিবীর সবাই মুসলমান হয়ে যেত। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার কাছেও আমাদের ঈমান আনয়নের আলাদা কোন গুরুত্বও থাকত না। ব্যাপারটা এরকম হলে এই পৃথিবীতে মানুষ পাঠানোরও কোন প্রয়োজন ছিল না।

 

কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা গায়েবের জিনিস গায়েবই রাখবেন। গায়েবের জিনিস উনি কখনোই প্রকাশ্যে আনবেন না। গায়েবের জিনিস প্রকাশ্যে আনলে তো এই পৃথিবীতে ঈমান আনা নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকত না, সবাই চন্দ্র-সূর্য দেখার মতোই মুসলমান হয়ে যেত। তখন আর আখিরাতের পরীক্ষা বলতে কিছুই থাকত না। আপনি না দেখে গায়েবের প্রতি বিশ্বাস করেন বলেই আপনার ঈমান আনা নিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করেন।

 

মুতাজিলাদের যুক্তি হলো পাপ-পুন্য من قبيل الاعراض যা মাপা সম্ভব নয় । বর্তমানে তাপমাত্রা মাপা হয় । অন্যান্য اعراض গুলো মাপার যন্ত্রও বেরিয়ে গেছে। বর্তমানে মুতাজিলারা  থাকলে তারা আর হাশরের দাড়িপাল্লা কে অস্বীকার করত না ।

 

তবে মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাস বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত নয়। মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাস অপরিবর্তনীয়। তবে আমি এখানে বিজ্ঞানকে নিয়ে এসেছি এটা বুঝাতে যে বিজ্ঞান দ্বারা এখন অনেক কিছুই এখন খুব সহজেই বুঝা যাচ্ছে। ব্যাস এতটুকুই। সারা পৃথিবীর সব বিজ্ঞান বিবর্তনবাদকে মানলেও আমরা মুসলমানরা সব সময়ই বলব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লাই আমাদের কে সৃষ্টি করেছেন।

 

[ এরকম আরো তত্ত্বীয় আলোচনা আপনারা খান প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত শাফিউর রহমান ফারাবী রচনা সমগ্র বইতে পাবেন ]

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button