আমরা নগদে বিশ্বাসী, বাকীতে নই

” আমরা নগদে বিশ্বাসী, বাকীতে নই, নগদ যা আছে হাত পেতে নাও, বাকীর খাতায় শূন্য। ” এই কথাগুলো সংশয়বাদীরা প্রায়ই বলে। বিশেষ করে আমাদের সময়ে তথাকথিত মুক্তমনারা এই কথাগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার বলত। নাস্তিকদের কথা হলো দুনিয়ার জীবন সামনে আছে, আমরা সেটাতেই বিশ্বাস করি। পরকালের জীবন দেখা যায় না, তাই আমরা আখিরাতের জীবনে বিশ্বাস করি না। এইক্ষেত্রে দুনিয়ার জীবনকে নাস্তিকরা নগদ আর আখিরাতের জীবনকে তারা বাকি বলে।
আমরা তথাকথিত নাস্তিকরাই প্রকৃত বুদ্ধিমান, আমরা নগদ দুনিয়ায় বিশ্বাসী আর মুসলমানরা বোকা, তারা না দেখা বাকীতে আখিরাতের জীবনে বিশ্বাসী। কিন্তু আসলেই কি নাস্তিকরা শুধু নগদে বিশ্বাসী, বাকিতে নয় ? আসুন এই ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করি।
আমাদের দেশে এসএসসি পাস করার পর অনেক সরকারি চাকুরিতে ঢোকা যায়। যেমন সেনাবাহিনীর সৈনিক, পুলিশের কনস্টেবল, বিডিআরের সিপাহী, জেলখানার কারারক্ষী প্রভৃতি। আর ইন্টার পাস করার পর সরকারী, বেসরকারি অফিসগুলোতে অফিস সহকারী পদে প্রচুর চাকুরি আছে। কিন্তু কখনোই কি আপনারা কোন সংশয়বাদীকে দেখেছেন, তারা S.S.C/H.S.C পাস করেই সরকারি বেসরকারি চাকরি খোঁজার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে? না, তারা ভালো চাকুরী পাবার জন্য অনার্স, মাস্টার্স এমনকি পিএইচডি পর্যন্ত করতে রাজি আছে।
এই কথাটা আসলে ঠিক সংশয়বাদীদের জন্য প্রযোজ্য নয়, আমাদের সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমরা সবাই ভালো চাকুরীর জন্য বাকিতে বিশ্বাসী, নগদে নয়। মেট্রিক, ইন্টার, অনার্স, মাস্টার্স এমনকি পিএইচডি পর্যন্ত করতে রাজি আছি আমরা একটা ভালো চাকুরি পাবার জন্য। বুয়েট থেকে পাস করা ইঞ্জিনিয়ারও করপোরেট ভালো চাকুরির জন্য সান্ধ্যকালীন এমবিএ কোর্সে ভর্তি হয় ! ভাবা যায় ব্যাপারটা ! কেউই এসএসসি, এইচএসসি পাস করে সিপাহী, জওয়ান বা অফিস সহকারী হতে চায় না। সবারই টার্গেট থাকে বিসিএস ক্যাডার বা নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকুরি।

কিন্তু আখিরাতের জীবনের কথা আসলেই আমরা সবাই নগদ দুনিয়ায় বিশ্বাসী হয়ে যাই। তখন আর আমরা বাকির কথা বলি না। আখিরাতের অনন্ত অসীম জীবনের জন্য আমরা দুনিয়ার সামান্য দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে পারি না। অথচ ভালো একটা চাকরির জন্য আমরা এই স্বল্প জীবনের ৩০ বছর পর্যন্ত ব্যয় করতে রাজি আছি। ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস করতে আমাদের কোন ক্লান্তি আসে না।
যারা S.S.C/H.S.C পাশ করে চাকুরীতে ঢুকে তারাই তো আসলে দুনিয়ার জীবনকে ভালোভাবে উপভোগ করে। অল্প বয়সে তাদের হাতে কাঁচা টাকা পয়সা আসে। বয়স ২০-২২ এর মাঝে তারা নারী সম্ভোগ করতে পারে, বৈধভাবে বা অবৈধভাবে। অল্প বয়সে তাদের বাচ্চাকাচ্চাও হয়ে যায়। কিন্তু এরপরও আমরা কেউই এত তাড়াতাড়ি চাকুরি জীবনে ঢুকতে চাই না। আমাদের সবার স্বপ্নই থাকে বড় কিছু হওয়ার।
কিন্তু যেই আখিরাতের জীবনের প্রশ্ন আসে, তখনই আমরা শয়তানের প্ররোচনায় দুনিয়ামুখী হয়ে যাই। বেশি ধর্মকর্ম করলে পড়াশোনার ক্ষতি হবে, মুখে দাড়ি থাকলে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে চাকুরি পাব না, সারাদিন খালি এই চিন্তা করি। ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার জন্য চিরস্থায়ী আখিরাতের জীবনকে কাটছাঁট করার ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানই সেরা।
সেক্ষেত্রে নাস্তিকদের সাথে আমাদের পার্থক্য হলো নাস্তিকরা যেহেতু ঈমান আনেনি, তাই তারা স্বাভাবিক ভাবেই আখিরাতের জীবনে বিশ্বাসী না। কিন্তু আমরা মুসলমানরা আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রেখেও দুনিয়ামুখী হয়ে যাই। মৃত্যু আবার কী ? মৃত্যু বলতে আসলে কিছু নেই, মৃত্যু যদি থেকেও থাকে তা আসলে অন্যদের জীবনে হবে, আমাদের জীবনে মৃত্যু বলতে কিছু নেই। মৃত্যু কখনোই আমাদের জীবনে আসবে না এই সব ভেবে আমরা মুসলমানরা আখিরাতের জীবন কে একপ্রকার অস্বীকারই করি।
আকাশে সূর্য, চন্দ্র উঠা নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। কারন সূর্য চন্দ্র যখন উঠে তখন সবাই দেখতে পারে। কিন্তু যত তর্কবিতর্ক সব আখিরাতের উপর বিশ্বাস নিয়েই। এখন জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা, দোযখ এগুলো যদি মানুষ চর্মচুক্ষে অবলোকন করতে পারত তাহলে তো আর আখিরাতের বিশ্বাস নিয়ে আর কোন তর্কবিতর্ক থাকত না। কিন্তু তখন আর গায়েবের উপর ঈমান আনার বিষয় টা থাকত না। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার কাছে ঈমানের আলাদা কোন গুরুত্বও থাকত না। গায়েবের জিনিস গায়েবই থাকবে এটাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার রীতি।
দুনিয়ার জীবন প্রতিদান দেয়ার ক্ষেত্র না আর নেকীর প্রতিদান পার্থিব জগৎ সহ্য করতে পারবে না। জান্নাতের নাজ নেয়ামত যদি মানুষ দেখতে পারত তাহলে সবাই খুশীতে আত্মহারা হয়ে মারা যেত। আবার জাহান্নামের শাস্তি যদি মানুষ দেখতে পেত তাহলে কেউই আর ভয়ে ঘর-সংসার করত না, সবাই জঙ্গলে চলে যেত। এটা আসলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার একটা রহস্য। বরযখ জীবনের দৃশ্যগুলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা ইচ্ছা করেই মানুষের কাছে আড়াল করে রেখেছেন যেন মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চালিয়ে যেতে পারে। গায়েবের জিনিস গায়েবই থাকবে দুনিয়াতে।
অনেকে আবার একজন খুনীর বিচার করার জন্য আখিরাত থাকার যৌক্তিকতা তুলে ধরে। তাদের কথা হল অনেকটা এরকম – “ ধরা যাক, একজন খুনি খুন করার পর ভিনদেশে পালিয়ে গেলো। নিহতের আত্মীয়স্বজন খুনির বিরুদ্ধে মামলা করলো। মামলায় খুনির ফাঁসির রায় হলো। খুনি ভিনদেশে স্বাভাবিক জীবন যাপন করে হায়াতে-জীন্দেগীর নির্দিষ্ট সময়সীমা শেষ করে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করলো। খুনির বিচারের রায় আর দুনিয়াতে কার্যকর করা সম্ভব হলো না! এরকম ঘটনা দুনিয়াতে অনেক আছে। প্রশ্ন হলো,আখিরাতের অস্তিত্ব না থাকলে এই বিচারটা কোথায় হবে? “
এই concept এর ব্যাপারে আমার উত্তর হল- “ শুধুমাত্র একজন খুনির বিচার হবে সেইজন্য আখিরাত থাকতে হবে ব্যাপারটা তা না। ধরেন ব্যক্তিগত জীবনে একজন ভালো মুশরিক যে জীবনে কখনো কোনদিন কোন খুন-খারাবি করে নাই, কিন্তু সারাজীবন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার সাথে শিরক করছে ; তার এই শিরকের শাস্তির জন্যও তো আখিরাত থাকা জরুরী। “ ব্যক্তিগত জীবনে অনেক ভাল কাফের-মুশরেকও জাহান্নামে যাবে।