ইতিহাসের কাঠগড়ায় ফারাবী


জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি শক্ত জবানবন্দী দিয়েছিলেন। যেটা পরবর্তীতে সাহিত্য আকারে “রাজবন্দীর জবানবন্দী” নামে বই আকারে বের হয়েছিলো। অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার শেষের দিকে আমি ৩৪২ ধারায় একটি ঐতিহাসিক জবানবন্দি দেয়। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পর বাংলাভাষায় এরকম শক্ত Three forty two/342/জবানবন্দী আর কেউ দিতে পারেনি। এই জবানবন্দীটাই এইখানে সরাসরি তুলে ধরা হল-
শাফিউর রহমান ফারাবী -এর লিখিত বক্তব্য
বরাবর : বিজ্ঞ জজ, সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল, মামলা নং- ২৬/১৯।
বিষয়ঃ- ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামীর জবানবন্দী।
আসামীর স্থায়ী ঠিকানা-
শাফিউর রহমান ফারাবী
পিতা- ফেরদৌসুর রহমান (মৃত)। মাতা- উম্মে সালমা শেলী (মৃত)।
রহমান ভিলা, কুমারশীল মোড়, কালাইশ্রী পাড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর।
জেলা- ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
আসামীর বর্তমান ঠিকানা-
শতাব্দী বিল্ডিং, নীচতলা ৭ নং রুম, কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয়
কারাগার, কাশিমপুর গাজীপুর।
জনাব,
যথাবিহীত সম্মান পূর্বক বিনীত নিবেদন এই যে, আমি শাফিউর রহমান ফারাবী আজকে দীর্ঘ ৬টি বছর কারাগারের ভিতর মানবেতর জীবন যাপন করছি। নিজের আসল নাম ও ছবি ব্যবহার করে লেখালেখি করার কারণে বারবার বামপন্থী মিডিয়ার আক্রোশের শিকার হয়েছি। আমি এই নিয়ে ৩ বার কারাগারে এসেছি। অভিজিৎ/ গাভীজিৎ/ সমজিৎ/ ভন্ডজিৎ হত্যা হয়েছে ২০১৫ সালের ২৬ শে ফেব্রুয়ারী। এর ঠিক ২ দিন পরেই RAB আমাকে গুম করে।
অভিজিৎ মারা যায় শাহবাগের TSC চত্ত্বরে। আর সেই সময় আমি সিলেটের ভাড়া বাসায় মুন্সীপাড়ায় ছিলাম। RAB আমাকে সিলেটের বন্দর এলাকা থেকে গ্রেফতার করে সাথে সাথে আমার চোখ বেঁধে ফেলে এবং দুই হাত পিছনে নিয়ে হ্যান্ডকাপ লাগিয়ে দেয়।
চার্জশীটের জব্দ তালিকা- ৫ এ দেয়া আমার ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বার ২টি 01710933470, 01836638195 Trace করলেই আপনি দেখতে পারবেন ২০১৫ সালের পুরো ফেব্রুয়ারী মাসটাই আমি সিলেটে আমার ভাড়া বাসায় ছিলাম। বিশেষ করে ২০১৫ সালের ২৬ শে ফেব্রুয়ারী যেদিন অভিজিৎ রায় হত্যাকান্ড সংঘটিত হয় সেদিন আমি মসজিদে এশার সালাত আদায় করে বাসায় ছিলাম। সিলেটের মুন্সীপাড়া এলাকার ইমাম, এলাকাবাসীকে জিজ্ঞাসা করলেই এই ব্যাপারটা খোলাসা হয়ে যাবে।
কিন্তু অন্ধকারে হেঁটে বেড়ানো কালো RAB ২০১৫ সালের মার্চের ২ তারিখ সংবাদ সম্মেলন করে বলে, তারা নাকি আমাকে ঢাকার যাত্রাবাড়ি এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে। আমি RAB এ মোট ৪ দিন ছিলাম। এই ৪ দিনেই RAB আমার দুই চোখ বেঁধে রেখেছিল এবং দুই হাতের পিছনে হ্যান্ডকাপ দিয়ে বেধে রেখেছিল। পরবর্তীতে আমি যখন DB (South) এ যাই, তখন ডিবি (দক্ষিণ) এর ADC ছিল মানস কুমার পোদ্দার এবং DC ছিল কৃষ্ণপদ রায়। আমি হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে অনেক লেখালেখি করার কারণে এই দুইজন আমার সাথে সাম্প্রদায়িক আচরণ করে।
২০১৫ সালের মার্চের ৩ তারিখ এ আমি যখন RAB থেকে ডিবি (দক্ষিণ) এর হেফাজতে থাকি, তখনই আমার বিরুদ্ধে ADC মানস কুমার পোদ্দার এবং DC কৃষ্ণপদ রায় মোট ৩টি মামলা Ready করে ফেলে। আমি DB (South) এ একটানা ২৩ দিন রিমান্ডে থাকি। রিমান্ডের এক পর্যায়ে রমনা জোনাল টিমের কনস্টেবল সাইফুল কবীর আমার দুই কানে একসাথে এতগুলি থাপ্পর মারে যে, আমার কান এখনো ব্যাথা করে। আমি আপনার কাছে এই ঘটনার বিচারপ্রার্থী।
সংবিধানে বলা হয়েছে, একটি ঘটনায় শুধুমাত্র একটি মামলা হবে। কিন্তু অভিজিৎ রায় -এর বিরুদ্ধে লেখালেখি করার কারণে আমার নামে ৩ টি মামলা হয়। এর মধ্যে সিলেটের ব্লগার অনন্ত বিজয় হত্যা মামলাটিও আমার নামে দেয়া হয়। এখানে উল্লেখ্য- অনন্ত বিজয় যখন নিহত হয় তখন আমি কারাগারে অন্তরীণ ছিলাম। এরপরেও ঐ মামলার চার্জশীটে আমার নাম দেয়া হয়।
অভিজিৎ মামলায় আমার রিমান্ড শুরু হয় ২০১৫ সালের মার্চের ২ তারিখ। আর অনন্ত বিজয় নিহত হয় ২০১৫ সালের মে মাসের ১২ তারিখ। এই মামলার একটি স্বীকারোক্তিতেও আমার নাম নেই। অভিজিৎ রায় সংক্রান্ত একটি স্ক্রীনশটের কারণে আমাকে অনন্ত বিজয় হত্যা মামলায় জড়িত করা হয়েছে। বর্তমানে ঐ মামলাটি সিলেটের সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। মামলা নং- সিলেট এয়ারপোর্ট ১২(৫)১৫।
নাস্তিকদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করার কারণে সাইবার ট্রাইব্যুনালে আমার নামে আরেকটি মামলা হয়। মামলা নং- ২৬/১৬। ঐ মামলায় বিজ্ঞ জজ আশ শামছ জগলু Sir আমাকে খালাস দেয়। আশা করি এই মামলায়ও আপনি আমাকে খালাস দিবেন।
এখন অভিজিৎ রায়ের ব্যাপারে আমি কিছু কথা বলব। এই মামলার চার্জশীটে অভিজিৎ রায়ের মুক্তমনা ব্লগের ১ টি লেখার কথা বলা আছে। লেখাটির নাম “বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নতুন সংযোজন ‘ধর্ম ও নৈতিকতা’ নিয়ে কিছু কথা।”
এই ব্লগে গাভিজিৎ রায় আল্লাহর রাসূলের ৩ জন সম্মানিত স্ত্রী উম্মুল মু’মিনীন হযরত সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াই রাযিয়াল্লাহু আনহা, উম্মুল মু’মিনীন হযরত জুয়ায়রিয়া বিনতে হারেস রাযিয়াল্লাহু আনহা, হযরত মারিয়া কিবতিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহাকে Concubine বা রক্ষিতা বলে পুরো মুসলিম জাতিকে অপমান করে।
এর মাঝে হযরত সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াই রাযিয়াল্লাহু আনহাকে আল্লাহর রাসূল খায়বার বিজয়ের পর বিয়ে করেন। এ সংক্রান্ত হাদীসগুলোকে বিকৃত করে অভিজিৎ রায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে চরম কিছু মিথ্যাচার করে। আমি এই ব্যাপারটি আমার ‘ফারাবী ব্লগ’ (www.farabiblog.com) এ প্রকাশ করেছিলাম। লেখাটির শিরোনাম “অভিজিৎ রায়ের হাদীস বিকৃতির কিছু নমুনা ১ম পর্ব” শীর্ষক ব্লগে প্রকাশ করেছিলাম। আমার এই লেখাটি সাইবার ট্রাইব্যুনালের মামলা নং- ২৬/১৬ তে সংরক্ষিত আছে। আমি আপনাকে অনুরোধ করেছিলাম সাইবার ট্রাইব্যুনালের আমার কেইস ডকেট/ CD টা নিয়ে এসে আমার এই লেখাটি পড়তে। কিন্তু আপনি তা করেননি। আমার যদি কোন ব্যক্তিগত উকিল থাকত, তাহলে আমি সাইবার ট্রাইব্যুনাল থেকে আমার লেখাগুলো ফটোকপি করে আপনাকে দেখাতাম। সাইবার ট্রাইব্যুনালের মামলা নং- ২৬/১৬ তে আমার farabiblog এর অনেকগুলি লেখা সংরক্ষিত আছে। কিন্তু আপনার ট্রাইব্যুনালের CD তে শুধু আমার ফেইসবুকের ৪ টি Status দেয়া হয়েছে। মামলার IO চালাকী করে আমার ফারাবী ব্লগের লেখাগুলি দেয়নি।
অভিজিৎ মামলার চার্জশীট এর জায়গাতেও IO বলেনি যে, অভিজিৎ রায় চরম ইসলাম বিদ্বেষী ব্লগার চক্রের নেতৃত্ব দিত। মূলতঃ অভিজিৎ রায় ছিল একটি বিষবৃক্ষ, যে নাস্তিক তৈরী করত। কিন্তু DB, CTTC এর কর্মকর্তারা অভিজিৎ রায়কে একদম গঙ্গাজলে ধুয়ে দিয়েছে। যেন অভিজিৎ রায় ধোয়া তুলসী পাতা, কোন দিন কোন অন্যায় করেনি। আমার দৃষ্টিতে নাস্তিকরা হচ্ছে পোকামাকড়ের ন্যায়, আর পোকামাকড়দের মরে যাওয়াই ভাল।
এই মামলার কেইস ডকেটে আমার নামে যে comment গুলো দেয়া হয়েছে, এর অনেকগুলো comment ২০১৫ সালের আগষ্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের। এতেই বুঝা যাচ্ছে, আমি জেলে যাবার পর RAB ও DB আমার ID ব্যবহার করে এই comment গুলি করেছে যেন তারা আমাকে আরেকটা বড় বিপদে ফেলতে পারে।
নিজের আসল নাম ও ছবি ব্যবহার করে ফেইসবুক ও ব্লগে লেখালেখি করার কারণে এই আওয়ামী লীগ সরকার আমাকে এই পর্যন্ত ৫টি মামলা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমি কারাগারে অন্তরীণ অবস্থায় আছি। আপনি দেখবেন, আমি কোর্টে একটি ভাঙ্গা চশমা পরে আসি। এই চশমাটা আমি কারাগারে ঢুকার আগে থেকেই ব্যবহার করি। এই দীর্ঘ ৬ বছর[1] আমি একটা নতুন চশমাও সংগ্রহ করতে পারিনি। মুক্ত জীবনে থাকা অবস্থায় কখনোই কোন বৈধ বা নিষিদ্ধ সংগঠনে জড়িত না থাকার কারণে কারাগারে ঢুকার পর থেকে কোনদিনও কোন গোষ্ঠি থেকে ১০ পয়সা ও পাইনি।
আল কায়দা/IS/আনসার-আল ইসলাম/ABT এই জাতীয় কোন নিষিদ্ধ সংগঠনের সাথে আমার কোন দূরতম সম্পর্ক নেই। আমি একজন মুসলিম হিসেবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অভিজিৎ রায়ের বিরুদ্ধে লেখালেখি করেছি। তাও সরকারের খাতায় আমি এখন একজন সক্রিয় আল কায়েদার কর্মী!
[1] ২০২১ সালে এই জবানবন্দী দেয়ার সময় আমার কাস্টাডি ৬ বছর ছিলো। অবশেষে ২০২৫ সালের ২২ আগষ্ট আমি যখন জামিনে মুক্তি পাই তখন আমার পূর্বের সকল কারাবাসের মেয়াদ প্রায় সাড়ে ১১ বছর।
পরিশেষে বাংলাদেশের নাস্তিকদের সম্পর্কে কিছু কথা বলি। বাংলাদেশে আমরা যাদের Free thinker বা মুক্তমনা হিসাবে ধারণা করি, তারা আসলে কেউই মুক্ত চিন্তার পথিক নয়। তারা মূলতঃ ইউরোপ আমেরিকার assylum প্রত্যাশী। ঘরে চাল নেই, চল মুসলমানদের নবী মুহাম্মাদকে গালিগালাজ শুরু করি! শিক্ষা-দীক্ষায় কম যোগ্যতা থাকার কারণে বা আর্থিক অসামর্থ্যের কারণে যাদের পক্ষে কোন দিনও ইউরোপ-আমেরিকা পাড়ি দেবার সামর্থ্য ছিল না, তারাই বর্তমানে মুসলমানদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালিগালাজ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলির নাগরিক হবার স্বপ্ন দেখছে।
আমার সাথে এই আওয়ামী লীগ সরকার এই আচরণগুলো করেছে, এ কারণে যেন ভবিষ্যতে আর কেউ কোন দিন আসল নাম, ছবি ব্যবহার করে নাস্তিকদের বিরুদ্ধে লেখালেখি না করে। মূলতঃ শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে একটি Atheist- Republic State এ পরিণত করতে চাচ্ছে।
যারা ধর্মের বিরুদ্ধে লেখালেখি করেছে শেখ হাসিনা তাদেরকে রাজকীয় কায়দায় ইউরোপ আমেরিকায় পাঠিয়ে দিয়েছে। আর আমি নাস্তিকদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করেছি, সে জন্য এই আওয়ামী লীগ সরকার আমাকে দীর্ঘদিন কারাগারে অন্তরীণ অবস্থায় রেখেছে। যাই হোক আমি আপনার কাছে এই মামলায় বেকসুর খালাস প্রার্থনা করছি।
স্বাক্ষর/ শাফিউর রহমান ফারাবী।
২৭/০১/২০২১