ল্যাটিন আমেরিকার দীর্ঘশ্বাস


আমেরিকা দেশটা নিয়ে কত হইচই হয়। আমেরিকা সারা পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করছে, আমেরিকা মুসলমান নিধন করছে এইসব তো প্রতি দিনই শুনি। আমেরিকার নামটা শুনলেই আমাদের হৃদয়ে একটা বেদনাদায়ক অনুভূতি জাগ্রত হয়।
ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯২ সালে আমেরিকা আবিষ্কার করে এটা মোটামুটি একটা প্রতিষ্ঠিত সত্য। কলম্বাসের আগেই মুসলমানরা আমেরিকা আবিষ্কার করেছিল, কিন্তু সেটা তেমন একটা জানাজানি হয় নি।
ইউরোপীয়ানদের ধারণা ছিল, পৃথিবী হচ্ছে ফ্ল্যাট বা সমতল। জাহাজ দিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের বেশি ভেতরে গেলে জাহাজ খাদের কিনারার নিচে পড়ে যাবে। মুসলমানরাই প্রথম প্রমাণ করে যে পৃথিবী গোল, এবং সমুদ্রের যত গভীরে যাও, জাহাজ কখনো কোনো খাদের কিনারায় পড়ে যাবে না। এবং সেই জন্যই আটলান্টিক মহাসাগরের একটানা ৭০ দিন অতিবাহিত হলেও ক্রিস্টোফার কলম্বাস নিশ্চিত ছিলেন, ডাঙা দেখা যাবে।
বিশাল আমেরিকা মহাদেশ যখন আবিষ্কার হয়, তখন মাইলের পর মাইল খালি জায়গা পরেছিল। পোপের নির্দেশে স্প্যানিশ ও পর্তুগিজরা নিজেদের মধ্যে আমেরিকাকে ভাগ বাটোয়ারা করে নেয়। পর্তুগীজরা নেয় দক্ষিণ আমেরিকা আর স্প্যানিশরা নেয় উত্তর আমেরিকা।
১৫০০ সালের দিকে উসমানীয় খেলাফত, মুঘল সাম্রাজ্য, আফ্রিকা মহাদেশের বেশ কয়েকটি রাজ বংশ বেশ শক্তিশালী ছিল। বেশি না, ১০ থেকে ১২টা যুদ্ধজাহাজ নিয়ে যদি স্প্যানিশ–পর্তুগিজদের মতো মুসলমানরাও আমেরিকা মহাদেশ পাড়ি দিত, তাহলে হয়তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আজকে একটি মুসলিম রাষ্ট্র হতো।
আধুনিক কালের ফিলিস্তিন, গাজা, ইরাক, আফগানিস্তান যুদ্ধ এইসব কিছুই হতো না। ক্রুসেডে যুদ্ধের সময়েই সম্মিলিত ইউরোপীয় শক্তি মুসলমানদের কাছে হেরেছে। পর্তুগীজ নামক ডাকাত জাতিকে নৌযুদ্ধে পরাজিত করা মুসলমানদের কাছে কোনো ব্যাপারই ছিল না।
মরক্কোর সাদিয়ান রাজবংশ ১৫৪৯ থেকে ১৬৫৯ সাল পর্যন্ত মরক্কো শাসন করেছিল এবং তারা পর্তুগীজদের বিরুদ্ধে বিজয়ের জন্য পরিচিত। ১৫৫৪ সালের দিকে সাদিয়ানরা ক্ষমতা সংহত করে এবং পর্তুগীজদের হটিয়ে তারা মরক্কোর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। অর্থ্যাৎ কলম্বাস পরবর্তী যুগেও আফ্রিকার মুসলমানরা একেবারে নেতিয়ে পরেনি। শৌর্যবীর্যে তারা কোন অংশেই ইউরোপীয়দের থেকে কম ছিল না। কিন্তু আফসোস মুসলমানরা তাদের এই শৌর্যবীর্য সাগরের বুকে কাজে লাগায় নি। নৌপথ সব সময় আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে।
যদিও মোঙ্গল আক্রমণের কারণে মুসলিম সাম্রাজ্য ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ১৩০০–১৪০০ এই দুই শতক গেছে মুসলিম সাম্রাজ্যকে দাঁড়াতে। সেই জন্যই হয়তো নতুন মহাদেশের নতুন বন্দোবস্তে মুসলমানদের কোনো আগ্রহ ছিল না।
স্পেন তখন ছিল পৃথিবীর শেষ প্রান্ত। স্পেনের পর আর কোনো দেশ ছিল কিনা, মানুষ এটা নিশ্চিতভাবে জানত না। আমেরিকা আবিষ্কারের পর স্পেন হয় পৃথিবীর মধ্যভাগ। ক্রুসেড যুদ্ধে হেরে যাওয়ার ফলে ইউরোপীয়দের কাছে প্রাচ্যের দরজা অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। তাই নতুন মহাদেশ আমেরিকার সন্ধান পাওয়ার পর ইউরোপীয়ানরা আর দেরি করে নাই।
নতুন মাটির ঘ্রাণ নেওয়ার জন্য ইউরোপীয়ানরা সব পাগল হয়ে যায়। আর মুসলমানরা তখন ইউরোপীয় মেয়েদেরকে নিয়ে নিজেদের হেরেমের সৌন্দর্য বর্ধনে ব্যস্ত ! হুররাম সুলতানা, কেসেম সুলতানা আছে না।
বলা হয় যে, ল্যাটিন আমেরিকার স্বর্ণের লোভে ইউরোপীয়ানরা দলে দলে প্রবেশ করে। এর চেয়ে বেশী স্বর্ণ তখন দক্ষিণাত্যের প্রাচীন মন্দিরগুলোতে ছিল।
পোপ ঠিকই রোমান ক্যাথলিক মিশন কে আনুষ্ঠানিক ভাবে আমেরিকায় পাঠায় সেই দেশের আদিবাসীদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করার জন্য। আনুষ্ঠানিকভাবে আমেরিকাকে রোমান ক্যাথলিক মিশনের আওতাভুক্ত করা হয়।
আর আমাদের মুসলিম নেতৃবৃন্দের কোনো ধারণাই ছিল না নতুন নতুন মহাদেশ আবিস্কার হওয়া প্রসঙ্গে। আর দাওয়াতি টিম পাঠানো তো অনেক পরের কথা। বেশি না, অল্প কিছু পেশাদার সৈন্য আর কয়েকটা গ্রামসংখ্যক মুসলমান যদি সেই ১৫০০ সালে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আমেরিকার মাটিতে পা রাখত, তাহলে হয়তো সাম্বা নৃত্যের বদলে ল্যাটিন আমেরিকায় আজ আজানের ধ্বনি শোনা যেত।
মানুষ মায়া সভ্যতা নিয়ে গবেষণা না করে ল্যাটিন আমেরিকার প্রথম মুসলিম সভ্যতা নিয়ে গবেষণা করত। ইতিহাসবিদরা মেক্সিকোর এজটেক সভ্যতার বদলে আর্জেন্টিনায় প্রথম মুসলিম জন বসতি নিয়ে গবেষণা করত। পনেরশ শতাব্দীর যেই সুযোগ মুসলমানরা হারিয়েছে; আজ মুসলমানরা সেই ভুলের কাফফারা নিজেদের রক্ত দিয়ে মিটাচ্ছে।
আমার এই কথাগুলো শুধু ল্যাটিন আমেরিকা নয় ভারতবর্ষের জন্যও প্রযোজ্য। রাজকোষে অর্থ সম্পদ উপচিয়ে পরছে কিন্তু কাউকে নও মুসলিম বানানোর খবর নাই। যেখানে অমুসলিমদের চিত্তাকর্ষণের জন্য যাকাতের টাকা দেওয়া জায়েজ আছে সেখানে রাজকোষের বাড়তি সোনা-দানা খরচ করে ভারতের হাজার হাজার হিন্দুকে মুসলমান বানানো আমাদের উপর ফরজ ছিল। রাজকোষের এই উপচিয়ে পরা স্বর্ণ রুপা ঠিকই পরে পারস্যের শিয়া সম্রাট নাদির শাহ নিয়ে যায়। আর বাকী যা ছিল তা নেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহর সাথে না মিলানোর শাস্তি আমরা এখন নরেন্দ্র মোদির দাস হয়ে দিচ্ছি।
ভারতে মোঘল ছাড়া যতগুলো মুসলিম রাজবংশ ছিল সুলতানি রাজবংশ, খিলজি রাজবংশ, লোদী রাজবংশ তারা সবাই ইসলামের জন্য কিছু না কিছু করেছে। কিন্তু মোঘলরা বিশেষত সম্রাট আকবর ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। আকবরের ৬০ বছরের রাজত্বকাল পুরোটাই গেছে কিভাবে ভারতবর্ষ থেকে ইসলাম ধর্মকে মূলোৎপাটন করা যায়। মুসলিম হেরেমে রাজপুত রমনী ঢুকিয়ে আকবর মুসলিম জন্মধারাকেই পরিবর্তন করে দিতে চেয়েছিল। তার উপর আল্লাহর লানত।
দু:খজনক হলেও সত্য মুসলমানরা কখনোই অফিসিয়ালি আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ায় দাওয়াতি কাজ করে নাই। ভারতবর্ষে সূফীরা যেইরকম বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু কাজ করেছে ল্যাটিন আমেরিকায় বা অস্ট্রেলিয়ায় তেমন টি হয় নি।