আস্তিকতা-নাস্তিকতা

Rational Method এ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলার অস্তিত্বের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ

আমাদের চারপাশে এই যে মহাবিশ্ব, সূর্য, চন্দ্র, আমি, আপনি এ সবকিছু নিয়েই কিন্তু আমাদের এই প্রকৃতি বা Nature। মানুষ হচ্ছে এই প্রকৃতির মাঝে শ্রেষ্ঠ জীব। আচ্ছা, মানুষ কি নিজে নিজে বাঁচতে পারে?

না, মানুষকে খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। এই খাদ্য কিন্তু মানুষের শরীর থেকে উৎপন্ন হয় না। মানুষ এই খাদ্য উদ্ভিদ ও প্রাণিকূল থেকে সংগ্রহ করে। তাই বলা যায়, মানুষ একটি পরাধীন সত্ত্বা। প্রকৃতির মাঝে এমন কোন প্রাণী নেই যে নিজে নিজে বাঁচতে পারে। প্রত্যেকটা প্রাণীই বেঁচে থাকার জন্য একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল।

আবার মানুষ চাইলেই সবকিছু করতে পারে না। মানুষ কিন্তু কোনো মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি করতে পারে না। পরীক্ষাগারে যেইসব কৃত্রিম মৌল (Synthetic Elements)  তৈরী করা হয় তা বিভিন্ন মৌলিক কণার সংঘর্ষ ঘটিয়ে তৈরি করা হয়, যেমন প্লুটোনিয়াম, টেকনেটিয়াম, আইনস্টাইনিয়াম, ফারমিয়াম, বোহরিয়াম। যেমন এমোনিয়াম সায়ানেট কে  (NH4NCO) উত্তপ্ত করে ইউরিয়া প্রস্তুত করা হয়। অর্থ্যাৎ মানুষ নিজে থেকে কোন মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি করতে পারে না। মানুষ হচ্ছে এই মহাবিশ্বের মাঝে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী। কিন্তু মানুষের পক্ষে কোনো মৌলিক পদার্থ নতুন ভাবে সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। তাই আমরা ধরে নিতে পারি যে, প্রকৃতির মাঝে আর কারও পক্ষেই কোনো মৌলিক পদার্থ একদম নতুনভাবে সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। আবার মানুষ আকার-আয়তনে সীমিত। সে চাইলেও তার থেকে খুব ভারী কোনো জিনিস উত্তোলন করতে পারে না। আবার মানুষ চাইলেও মৃত্যুকে ঠেকাতে পারবে না। তাই আমরা বলতে পারি, মানুষ হল একটি সীমাবদ্ধ ও পরাধীন সত্ত্বা।

 

শুধু মানুষ নয়, আমাদের প্রকৃতির মাঝে আপনি এমন কোন সত্ত্বা খুঁজে পাবেন না, যেটা Unlimited (সীমাহীন), Infinite (অসীম) ও Independent (স্বাধীন); বরং Nature বা প্রকৃতির প্রত্যেকটি সত্ত্বাই Limited (সীমিত), Finite (সসীম) এবং একে অন্যের প্রতি Dependent (নির্ভরশীল)। এই Nature বা প্রকৃতির কোন সত্ত্বাই মৌলিক কোন পদার্থ তৈরি করতে পারে না। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র এগুলোও কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন মেনে চলে। এই মহাজাগতিক উপাদানগুলোও অসীম নয়, আকার-আয়তনে সসীম। বলা হয় যে, এই মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু মহাবিশ্বের এই প্রসারণটাও কিন্তু একটি সীমার মধ্য থেকেই হচ্ছে। মহাবিশ্ব যদি অসীমই হতো, তবে তো আর সে প্রসারিত হতো না। তাছাড়া এই মহাবিশ্ব আবার একসময় সংকুচিত হয়ে তার পূর্বের সত্ত্বায় ফিরে আসবে। তাই এই মহাবিশ্বকে আমরা অনন্ত ও অসীম বলতে পারি না।

 

এবার আসুন প্রকৃতি বলতে আমরা কী বুঝি?

প্রকৃতি কিন্তু এই মহাবিশ্ব ও সকল প্রাণিজগৎ—এগুলোরই সমষ্টি। অনেকগুলো সীমাবদ্ধ বস্তুর সমষ্টি কিন্তু সীমাবদ্ধই হবে। ১, ২, ৩—এরকম আপনি যত সংখ্যাই যোগ করুন না কেন, এগুলোর সমষ্টি কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাই হবে, কখনই অসীম কোনো সংখ্যা হবে না। যেহেতু প্রকৃতি বা Nature সব Dependent, Finite এবং Limited সত্ত্বার সমষ্টি, তাই প্রকৃতিও একটা Dependent, Finite এবং Limited সত্ত্বা।

এখন প্রকৃতি নিজেই যেহেতু একটি সীমাবদ্ধ সত্ত্বা, তাই প্রকৃতির এই ক্ষমতা নেই যে, সে নিজে থেকে কোন মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি করবে, তাই সম্মিলিত ভাবে প্রকৃতিরও এই ক্ষমতা নেই যে, এই মহাবিশ্বকে সে নিজ থেকে সৃষ্টি করবে।

তাই প্রকৃতি যদি নিজে নিজেকেই সৃষ্টি করতে না পারে, তাহলে এই প্রকৃতি ও এই মহাবিশ্বকে কে সৃষ্টি করেছেন?

আমরা যদি এখন Rational Method বা স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করি, তাহলে দেখবো যে, প্রকৃতিও যেহেতু নিজে নিজেকে সৃষ্টি করতে পারে না, তাহলে এই প্রকৃতির অবশ্যই একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। আর সেই সৃষ্টিকর্তাকে অবশ্যই একটি স্বাধীন, অনন্ত ও অসীম সত্ত্বা হতে হবে এবং এই সৃষ্টিকর্তা অবশ্যই কারো প্রতি নির্ভরশীল হবেন না। এই মহান সৃষ্টিকর্তার নামই হলো ‘আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা’।

এখন প্রশ্ন হল, এই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে কে সৃষ্টি করেছেন? এর তিনটি উত্তর রয়েছে। হয় আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে কেউ তৈরি করেছেন, বা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নিজে নিজেকে তৈরি করেছেন, অথবা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা হচ্ছেন একটি অনন্ত, অসীম ও আযালী সত্ত্বা, যাঁকে কেউ সৃষ্টি করেনি।

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে যদি কেউ সৃষ্টি করেন, তাহলে তো আর তিনি আল্লাহই হলেন না। এখন দ্বিতীয় উত্তরের দিকে যদি যাই, তাহলে দেখবো যে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নিজে নিজেকে তৈরি করেছেন এটিও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এটা করতে হলে আগে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে নিজের অস্তিত্বে আসতে হবে। এরপর নিজে নিজেকে তৈরি করতে হবে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যদি আগেই অস্তিত্বে এসে পড়েন, তাহলে আর নিজেকে সৃষ্টি করার কী দরকার?

 

বাকী রইল তৃতীয় উত্তরটি। হ্যাঁ, তাহলে তৃতীয় শর্তটাই সঠিক। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা হচ্ছেন একটি আযালী বা অনন্ত-অসীম সত্ত্বা, যাঁকে কেউ সৃষ্টি করেনি। আল কুরআনের সূরা ইখলাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নিজের সম্পর্কে যা বলেছেন, এটাই আমাদের মানতে হবে যে,

لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُوْلَدْ

অর্থ: “তাঁকে কেউ সৃষ্টি করেনি, আর তিনিও কাউকে জন্ম দেননি।” (সূরা ইখলাস, আয়াত ৩)

তিনি হলেন একটি আযালী বা অনন্ত, অসীম সত্ত্বা। যখন কেউ ছিলো না, তখনও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ছিলেন, আর যখন কেউ থাকবে না, তখনও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা থাকবেন।

আর মানুষ হচ্ছে একটি সসীম সত্ত্বা। একটি সসীম সত্ত্বা কখনোই একটি অনন্ত, অসীম ও আযালী সত্ত্বাকে বুঝতে পারবে না। একটি পাখি যেমন কোনদিন মানুষের মস্তিষ্ককে বুঝতে পারবে না, পশুপাখি যেমন কখনো ল্যাপটপ কীভাবে চলে তা জানতে পারবে না, ১টি পিঁপড়া যেমন কখনো AI বুঝতে পারবে না, ঠিক তেমনি আমরা মানুষরাও কখনোই দুনিয়ার জীবনে পুরোপুরিভাবে মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার মারেফত বা পরিচয় বুঝতে পারব না। আল কুরআনে এবং সহীহ্ হাদীসে (হাদীসে কুদসীতে) আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নিজের সম্পর্কে যতটুকু বলেছেন, ততটুকুর ওপরই আমাদেরকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। কারণ মানুষ হচ্ছে একটি সসীম সত্ত্বা, আর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা হচ্ছেন একটি অনন্ত, অসীম ও আযালী সত্ত্বা। আল্লাহর সত্ত্বা সম্পর্কে এর থেকে বেশি চিন্তা করলে আমাদেরকে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হবে।

 

এজন্যই সালাফ উলামায়ে কিরামগণ বলতেন,

تفكروا في خلق ولا تتفكروا في الله   فأنكم لن تقدروا قدره.

অর্থ: “তোমরা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা ও গবেষণা করো, আল্লাহর স্বত্বা সম্পর্কে বেশি গবেষণা করো না, কেননা তোমরা তা আয়ত্ব করতে পারবে না।”[1]

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন,

تفكروا في كل شيء ولا تفكروا في ذات الله.

অথ: “সবকিছু নিয়ে চিন্তা করো, তবে আল্লাহর সত্ত্বা নিয়ে চিন্তা করো না।”

ইমাম মালিক (রহ.) বলেন,

الاستواء معلوم والكيف مجهول، والإيمان به واجب، والسؤال عنه بدعة.

অথ: “আল্লাহর আরশে প্রতিষ্ঠা (استواء) জানা যায়, কিভাবে—তা অজানা; এতে ঈমান রাখা ফরজ; আর এ সম্পর্কে বেশি প্রশ্ন করা বিদআত।”

 

(তথ্যসূত্র: আমি এই নোটটি লেখার ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের প্রবাদপুরুষ ফিলিস্তিনের শাইখ তাকিউদ্দিন আন-নাবাহানির লেখা ‘নিজামুল ইসলাম’ (The System of Islam/ইসলামী জীবন ব্যবস্থা) বইয়ের সাহায্য নিয়েছি।)

 

[1] বায়হাকী, শু‘আবুল ইমান ১/১৩৭। আবু নু‘য়াইম, হিলিয়াতুল আওলিয়া ২/১৩৪। দায়লামী, মুসনদুল ফিরদাউস ৩/৬১।

One Comment

  1. মাশাআল্লাহ, আল্লাহ তাআলা আপনাকে জাযায়ে খায়ের দান করুন 🤲🤲

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button