ইতিহাস
মানব জাতির প্রতি আল্লাহর রাসূলের সবচেয়ে বড় এহসান কি ছিল ?


একই ভাষাভাষী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর রাসূলের আগমনের পূর্বে জাহেলী যুগে আরব জাতির মাঝে আল্পস পর্বতের ন্যায় দুর্ভেদ্য প্রাচীর খাড়া হয়েছিল। এক গোত্রের সাথে আরেক গোত্রের কোনো সম্পর্কই ছিল না। আসমান ও জমীনের মাঝে যে ব্যবধান থাকে, মানুষের সাথে মানুষের ঠিক সেই পরিমাণ ব্যবধানই ছিল। রাজা-বাদশাহরা তাদের প্রজাদেরকে মানুষই বলে মনে করত না। উচ্ছিষ্ট খেয়েই প্রজাদের দিন অতিবাহিত হতো। রাজার অধীনস্থ প্রজারা নিজেদেরকে মানুষ ভাবতে ভয় পেত। জুলুম এত বেশি ছিল যে, পুরো মানবজাতি যে একই জাতি—একতা, সাম্য ও মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার কোনো ধারণাই ছিল না আমাদের মাঝে।
এরপর আমাদের নবীজির আগমনে ; সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জনের ন্যায় দীর্ঘকালের স্তব্ধতা খান খান করে ভেঙে গেল। মহাকালের স্তরে স্তরে জমে থাকা অন্ধকারকে ভেদ করে, সৌরলোকের ন্যায় মানব মস্তিষ্কের নিউরনে আমাদের নবীজির এই বাণী অনুরণিত করল—“তোমরা সবাই আদম সন্তান, আর আদমকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। কালোর উপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, অনারবদের ওপর আরবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তোমাদের রব এক, তোমাদের পিতৃ পুরুষও এক।”
আল্লাহর রাসূলের এই ঘোষণা—“তোমাদের রব এক, তোমাদের পিতৃপুরুষও এক”— এই এক কথার মাধ্যমে মানবজাতি যেমন বহু ঈশ্বরের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে একেশ্বরবাদের দিকে ধাবিত হল, ঠিক তেমনি মানবজাতির মাঝে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধও জাগ্রত হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনে মানব জাতি যখন বুঝতে পারল তাদের সবার পিতৃ পুরুষ এক, একই পিতা-মাতার ঔরস থেকে তাদের সবার জন্ম; এই সত্য কথন শতধা-বিচ্ছিন্ন ও বহু ভাগে বিভক্ত মানবসমাজকে ঐক্য ও সাম্যের বন্ধনে আবদ্ধ করল।
কিন্তু আল্লাহর রাসূলের আগমনের পূর্বেকার চিত্রটা একটু কল্পনা করুন—বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ বন্দী ছিল সামান্য গায়ের রং, বংশ-মর্যাদা, উঁচু-নিচু, ধনী-গরিব, আর শাসক ও শোষিতের মাঝে। একজন মানুষ যে আরেকজন মানুষ কে আপন করে ভাবতে পারবে—সেটা সে ভুলেই গিয়েছিল।
জাহেলি যুগে জনগণ থেকে নিজেদের কে আলাদা বুঝাতে রাজা বাদশাহরা নিজেদের কে চন্দ্র সূর্যের বংশধর বলে দাবী করত। জাপানি সম্রাটরা খোলাখুলিভাবেই বলত – “এক চন্দ্র দেবী ছাড়া আমরা আর কারো কাছেই দায়বদ্ধ নই। ” রাজপ্রাসাদ থেকে ঘোষণা আসত – ” আমাদের সম্রাট! যিনি সূর্যের সাথে উদিত হন সূর্যালোক হয়ে, অন্ধকার রাত কে ছাপিয়ে তোলেন উজ্জ্বল আলোকময়। “
সে সময়ে মানুষ শুধু নিজ হাতে বানানো রঙ-বেরঙের মূর্তির পূজাই করত না, আকাশ থেকে কোন উল্কাপিণ্ড পৃথিবীর মাটিতে পরলে সেই উল্কাপিন্ডের পূজাও মানুষ পর্যন্ত করত। যেই মানুষ ছিল সৃষ্টির সেরা জীব আশরাফুল মাখলুকাত, সেই মানুষই পৌত্তলিকতার চাপে রঙ বেড়ঙের মাটির মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ে থরথর করে কাঁপত। সেই সময়ে মানুষের চেয়ে মূর্তির দাম বেশী ছিল।
মানুষ যে শুধু মিথ্যা মাটির গড়া মূর্তির পূজা করত শুধু তাই নয়, এই মানুষই মিথ্যা কালো উপাস্যকে খুশী করার জন্য নরবলি পর্যন্ত দিত। আজ থেকে ১০০ বছর আগেও যারা সেই কালো কুৎসিত ঈশ্বরীকে খুশী করার জন্য, তাজা মানব খুলি মন্দিরের বেদীতে নৈবেদ্য হিসাবে দিত; তারাই আজ আসছে কিনা মুসলমানদের কে সভ্যতা শিখাইতে !
মরুভূমি, সমতল, গিরিপথের চলতি পথে শিকারী ঈগলের ন্যায় দাস ব্যবসায়ীরা ছো মেরে মানুষকে ধরে নিয়ে যেত। এরপর দাস হিসেবে গৃহপালিত গরু-ছাগলের ন্যায় তাদের কে হাটবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হতো। সফরের চলার পথের রাস্তাগুলো ছিল দাস ব্যবসায়ীদের অভয়ারণ্য। শিকারি ঈগলের ন্যায় দাস ব্যবসায়ীরা মানব শিকার করত। মানুষ ছিল তখন বেচাকেনার একটা পণ্য বই কিছু না।
আজ মানুষ পেরিয়ে এসেছে বিদ্যা-বুদ্ধি, সভ্যতা-সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণার এক সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমা ; কিসের বদৌলতে ? আল্লাহর রাসূলের আগমনের বদৌলতে। আল্লাহর রাসূলই মানুষকে মানুষ হিসেবে ভাবতে শেখান। মানুষ যে সৃষ্টির সেরা জীব আশরাফুল মাখলুকাত সেটা সে আল্লাহর রাসূলের আগমনের পূর্বে ভুলেই গিয়েছিল।
মানব জাতির উপরে আল্লাহর রাসূলের সবচেয়ে বড় এহসান কী ? মানব জাতির উপর আল্লাহর রাসূলের সবচেয়ে বড় এহসান হল উনি মানুষ কে সে নিজে যে একজন মানুষ এটা বুঝতে পারার বুঝশক্তি দান করেছিলেন। জুলুম এত বেশী ছিল যে মানুষ নিজেকে একজন মানুষ ভাবতে ভয় করত, সে নিজেকে চতুস্পদ প্রাণীর ন্যায় একটি জীব-জন্তু বলে মনে করত।
রাজা-বাদশাহদের খামখেয়ালি যুদ্ধে নিজেদের প্রাণ হারানো, অন্যথায় মাত্রাতিরিক্ত খাজনা পরিশোধ এগুলো করতে করতেই প্রজাদের জীবন অতিবাহিত হত। মানবতা মুখ থুবড়ে পড়েছিল রাজপ্রাসাদের চার দেয়ালের মাঝে। এই চিরন্তন জুলুম থেকে মুক্তি দিয়ে মানুষকে মানুষ হিসেবে বাচতে পারাটা শেখাটাই ছিল মানব জাতির উপর আল্লাহর রাসূলের সবচেয়ে বড় এহসান, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ মানুষের মাঝে যে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দিয়েছেন, আজও সেটাই আমাদের জন্য় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
this is a testing comment