কোর্ট কাচারি

কেইস পার্টনার বিভীষিকা

 

কোন মামলার কেইস পার্টনার বলতে বোঝায় পরস্পর যোগসাজশে একটি ঘটনা ঘটানো হয়েছে এবং সেই ঘটনার পরস্পর সুবিধাভোগী। যেমন, কয়েকজন বন্ধু মিলে কারো ঘরে ডাকাতি করল এবং ডাকাতির মাল পরস্পর ভাগ করে নিল, বা কয়েক জন বন্ধু মিলে একটি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটালো। অর্থাৎ যেই অপরাধ পরস্পর যোগসাজশে করা হয় এবং সেই অপরাধ সংঘটনে যারা জড়িত থাকে, তাদেরকেই পরস্পর কেইস পার্টনার বলা হয়।

আমাকে মোট ৫ টি মামলায় জড়ানো হয়েছিল। এর মাঝে ৩ টি তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায়। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার মামলায় আমার কোনো কেইস পার্টনার ছিল না। এইসব মামলায় আমি একাই আসামি ছিলাম। আর আমার বিরুদ্ধে যে ২ টি ব্লগার হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল অভিজিৎ রায় এবং সিলেটের অনন্ত বিজয়, সেখানে আমার সঙ্গে কিছু কাল্পনিক কেইস পার্টনার সরকারিভাবে দেওয়া হয়েছিল।

অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার প্রধান আসামি হচ্ছেন মেজর জিয়া, যার সঙ্গে আমার কোনো পূর্বপরিচয় ছিল না। আর এটা তো একটা অসম্ভব ব্যাপার যে আমি সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে যেয়ে একজন মেজরের সঙ্গে অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলব।

এরপর বাকি থাকে মোজাম্মেল হোসাইন সায়মন এর কথা। মোজাম্মেল হোসেন সায়মন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০তম ব্যাচের ছাত্র ছিল। তার ৩ টা ফাঁসি ভাবা যায় ? একটা অভিজিৎ রায় হত্যা মামলা, দ্বিতীয়টা অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশক জাগৃতি প্রকাশনীর দীপন, আর তৃতীয়টা কলাবাগানের জোড়া খুন—জুলহাস-তন্ময়।

CRPC ( Criminal Procedure Code) এ বলা আছে, কারো যদি একাধিক ফাঁসি থাকে, তাহলে তুমি তাকে ঝুলিয়ে দাও। একাধিক ফাঁসির আসামি সমাজের আবর্জনা আর রাষ্ট্রের কলংক।মোজাম্মেল হুসাইন সাইমনকে যদি এখন ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়, এতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ড সারা পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই সময়ে সরকারের উপর খুব চাপ ছিল কিছু সংখ্যক আসামিকে দেখানো। আমি অভিজিৎ রায়ের বিরুদ্ধে লেখালেখি করেছি এতে কোনো সন্দেহ নাই। আমি সেটা বিচারিক আদালতেও স্বীকার করেছি; আমার 342 এর প্রমাণ। অভিজিৎ রায় দেশে এসেছে সেটাও আমি জানতাম। সাপ্তাহিক সাতকাহন পত্রিকার সম্পাদক আরিফুর রহমানই আমাকে তা জানিয়েছিল।

কিন্তু মেজর জিয়া, মোজাম্মেল হোসাইন সাইমন না তারা অভিজিৎ রায়কে চিনত, না তারা অভিজিৎ রায়ের বিরুদ্ধে লেখালেখি করেছে, না তারা অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের সময়ে ঘটনাস্থলে ছিল।

অভিজিৎ রায় হত্যা মামলা প্রথমে ৩০২ ধারায় রুজু হয়েছিল। এরপর CTTC যখন দেখেছে ৩০২ ধারায় মানুষগুলোকে ভালোভাবে জবাই করা যাবে না, তখন তারা সন্ত্রাস দমন আইনে অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার চার্জশিট দেয়; যেন মানুষগুলোকে ভালোভাবে জবাই করা যায়।

৩০২ ধারা যেহেতু ব্রিটিশ কারিকুলাম, তাই এই আইনে কোন নির্দোষ ব্যক্তিকে সাজা দেওয়াটা একটু কঠিন। কিন্তু সন্ত্রাস দমন আইনে কাউকে বায়বীয় অভিযোগে Capital Punishment দেওয়াটা খুব সহজ। ঠিক এই কাজটাই করেছে পলাতক শেখ হাসিনা সরকার।

২০১৫–১৬ সালে দেশের সিরিজ ব্লগার হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় জুলুমের শিকার মোজাম্মেল হুসাইন সাইমন। একজন তরুণ প্রকৌশলীকে পলাতক শেখ হাসিনা সরকার পরপর তিনটি মামলায় ফাঁসির রায় দেয়। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এত বড় কাঠামোগত জুলুম কারো উপর হয়েছে কিনা, আমার সন্দেহ।

শেখ হাসিনার নির্দেশে দেশে সিরিজ ব্লগার হত্যাকাণ্ড হয়ে যাওয়ার পর সরকারের ওপর খুব চাপ ছিল কিছু আসামিকে দেখানোর। আর সেটা সরকার ফারাবী, মেজর জিয়া ও মোজাম্মেল হোসেন সাইমনকে দাঁড় করিয়ে দেখিয়েছে।

অভিজিৎ রায় হত্যা মামলা ঢাকা সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালে বিচার হয়েছে। বিচারক মুজিবুর রহমানকে আমি অনেকবার বলেছিলাম স্যার, এই সাইমন, আরাফাত, আবু সিদ্দিক সোহেল এদের কাউকেই আমি কখনো দেখিনি কখনো পরিচয়ও হয়নি। তাহলে আমি কিভাবে তাদের সাথে এখন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছি।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় দেশবাসীর উদ্দেশ্যে মোজাম্মেল হুসাইন সায়মন একটি খোলা চিঠি লিখেছিল। আমি সেই খোলা চিঠিটা তার পরিবারের সহযোগিতায় হস্তগত করেছি এবং ফারাবি ব্লগে প্রকাশ করেছি। আপনারা ফারাবী ব্লগ থেকে সেই চিঠিটা পড়তে পারবেন।

দেশবাসীর উদ্দেশ্য মুজাম্মেল হোসাইন সায়মনের খোলা চিঠিটা আপনারা ফারাবী ব্লগে পুরোটা পাবেন। “মোজাম্মেল হুসাইন সায়মন VS ফ্যাসিবাদ” এই শিরোনামে

এতদিন হয়ে গেল আজ পর্যন্ত জানা গেল না কে গাভিজিৎ রায় কে কুপিয়ে ছিল। কিন্তু কতগুলো নিরীহ ছেলেপুলেদের কে ধরে বিচারের নামে প্রহসন করে শেখ হাসিনা সরকার তাদের ফাঁসির রায় দিয়ে দিল। কত ফ্যামিলি ধ্বংস হয়ে গেল বিচারকদের এইসব ফরমায়েশি রায়ের কারণে।

রাষ্ট্রই যখন তার মেধাবী সন্তানকে কারাগারে নিক্ষেপ করে, পর পর ৩ টা মামলায় ফাঁসির রায় দেয় তখন রাষ্ট্রই তো হচ্ছে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী।

শায়খুল ইসলাম হযরত হোসাইন আহমদ মাদানী রহমাতুল্লাহ আলাইহি ব্রিটিশ আমলে মহারানী ভিক্টোরিয়ার বিরুদ্ধে একটি শক্ত জবানবন্দি দিয়েছিলেন। উনার সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমিও অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার শেষের দিকে ৩৪২ ধারায় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একটা শক্ত জবানবন্দি দিয়েছিলাম। পার্থক্য হল ব্রিটিশ রানী মহারানী ভিক্টোরিয়ার বিরুদ্ধে জবানবন্দি দেওয়ার কারনে শায়খুল ইসলাম হযরত হোসাইন আহমদ মাদানী রহমাতুল্লাহর সাজা হয়েছিল ২ বছর আর শেখ হাসিনা কে কোর্টে নাস্তিক বলার কারণে আমার সাজা হয়েছিল ৩২ বছর। এটাই শেখ হাসিনা আর ব্রিটিশদের মাঝে পার্থক্য। শেখ হাসিনার জুলুমের মাত্রা ব্রিটিশদেরকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আমার জবানবন্দিটা এখানে পুরোটা পাবেন

কেস পার্টনার নিয়ে একটি লোমহর্ষক ঘটনার কথা আপনাদের কে বলি। সে সময়ে DB, RAB, CTTC ও ATU সব সংস্থাই কথিত islamist দের ধরে ধরে সন্ত্রাস দমন আইন ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা দিত। অনেক ক্ষেত্রে শুধু ফেসবুকে ঘন ঘন ইসলামি পোস্ট করা কিংবা বিভিন্ন জিহাদি সাইট ভিজিট করার অভিযোগেই কাউকে গ্রেপ্তার করে Militancy Act এ মামলা দেওয়া হতো।

একটি মামলায় সাধারণত পাঁচ থেকে ছয়জন কেইস পার্টনার থাকত। কারণ,পাঁচজনের কম আসামি থাকলে Militancy মামলা গুলো ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো যেত না।

একবার DB Police একটি তথাকথিত জঙ্গি মামলায় পঞ্চম আসামিকে ধরতে তার বাসায় যায়। কিন্তু তার বাসায় গিয়ে দেখা যায় আসামি সেখানে নেই। অথচ মামলার জন্য পঞ্চম আসামি অবশ্যই লাগবে। উপায় না পেয়ে সংশ্লিষ্ট Inspector ফোন করেন AC/Assistant Comissioner কে।

Inspector বলেন,

“Sir, পঞ্চম আসামি পাচ্ছি না। কী করব?”

এর উত্তরে AC Sir বলেন,

“আশেপাশে কোনো দাড়ি-টুপিওয়ালা লোক যাকেই পাও, তাকেই ধরে নিয়ে এই মামলার পঞ্চম আসামি বানিয়ে দাও।”

শুধু সাইমন না সেই সময় সন্ত্রাস দমন আইনে যাকে তাকে ধরে মামলা দেওয়া হত। কত পরিবার যে ধ্বংস হয়ে গেছে এর হিসাব নাই।

মামলা হচ্ছে আসলে পুলিশের কাছে just একটা খেলা, একটা সাদা কাগজ একটা ফরওয়ার্ডিং এরপর সেটা কোর্টে পাঠালেই আপনার বিরুদ্ধে একটা ওয়ারেন্ট জারি হয়ে যাবে। এখন আপনি পারলে লাখ লাখ টাকা খরচ করে জামিন করে বের হন বা জেল খাটেন। স্বামী জেলে যাবার পর কত পর্দানশীন মহিলা যে গার্মেন্টসে চাকরি করেছে এর ইয়াত্তা নেই। কত সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েকে দিনের পর দিন হাইকোর্ট, জজকোর্টে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে স্বামীর জামিনের জন্য। আমরা isLamist রা ছিলাম রাষ্ট্রযন্ত্রের খেলনার বস্তু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button