আক্বীদা

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আগমন: মানব জাতির মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক পরিবর্তন

এই মানব সভ্যতার ইতিহাস এক দীর্ঘ ইতিহাস। এই মানবজাতি বড় বড় যুদ্ধে যেমন অনেককে পরাজিত করেছে, অনেক আদমসন্তানকে দাস বানিয়েছে। আবার অনেক সময় নিজেকে খোদা দাবি করেও বসেছে। আবার এই মানুষই সামান্য কিছু কীট-পতঙ্গ, জীবজন্তুকেও তার খোদা বানিয়েছে। এই আধুনিক যুগেও অনেকে সাপ, ব্যাঙ, গরুর মাঝে ঈশ্বরকে খুঁজে বেড়ায়। আবার অনেক সময় মানুষ হাতে বানানো এমন কিছু মূর্তিকে পূজা করে; যাদের না আছে কোনো ভিত্তি না আছে কোনো বাস্তবতা। ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্বে সেইসব মূর্তি-নামক ঈশ্বরের কোনো নাম নিশানাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

মানুষ শুধু নিজের হাতে গড়া মূর্তিকেই পূজা করত না, তারা ভয় করত সেই মূর্তিকে, মঙ্গল কামনা করত তার কাছে। কি এক হাস্যকর ব্যাপার! একদিকে মানুষ নিজেই নিজেকে খোদা দাবি করত, আবার অন্যদিকে এই মানুষই সাপ, ব্যাঙ, কীট-পতঙ্গ, নদী-নালা, গরু-ছাগল এবং সর্বশেষ কিছু বায়বীয় মূর্তির কাছে নিজের ঈশ্বরভিত্তিক বিশ্বাস অর্পণ করত।

একদিকে মানুষের অহংকার আকাশচুম্বী, অন্যদিকে সে নদী-নালা আর বায়বীয় কাল্পনিক দেবীর কাছে নিজের ভাগ্য সঁপে দিচ্ছে। এরপর দীর্ঘ সময় পর এই পৃথিবীর বুকে আমাদের নবীজির আগমন ঘটলো। মানবজাতির প্রতি আল্লাহর রাসূলের সবচেয়ে বড় এহসান কী ? আল্লাহর রাসূল মানুষের হৃদয় থেকে যেমন মানুষের ভয় দূর করলেন, ঠিক তেমনি মানুষের হৃদয় থেকে সাপ-ব্যাঙ, গরু-ছাগল এবং বায়বীয় মূর্তি গুলোর ভয়ও দূর করলেন।

মানুষের প্রতি তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান কী ছিল? ​তিনি মানুষের হৃদয় থেকে সৃষ্টির প্রতি ভয় দূর করে স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করলেন। ​তিনি মানুষকে জানালেন—মানুষ কোনো মূর্তির দাস নয়, বরং মানুষ হলো আল্লাহর ‘খলিফা’ বা প্রতিনিধি। ​উপকার কিংবা অপকার করার ক্ষমতা কোনো সৃষ্টির নেই; একমাত্র আল্লাহই সার্বভৌম।

উনি মানুষকে সৃষ্টিজগতের ভিতরে নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন করলেন। আল্লাহর সৃষ্টির মাঝে মানুষই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, পৃথিবীর নেতা এবং পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান কার্যকর করার ‘প্রতিনিধি’। উপকার এবং অপকার করা, দেওয়া এবং ছিনিয়ে নেবার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই। শুধু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লাই পারেন মানুষের প্রয়োজন পূরণ করতে। কোনো সৃষ্টিজীবের এই সাধ্য নেই মানুষের উপর কোন খোদায়ী প্রভুত্ব বিস্তার করা।

আসমান জমিনের রব শুধু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা; রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর আবির্ভাবের পর সারা পৃথিবীতে এই কথা উচ্চারিত হতে লাগল। একত্ববাদের কথা তখন সারা পৃথিবীতে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে লাগল। অথচ ইতিপূর্বে এই একত্ববাদী আক্বীদাই ছিল পৃথিবীর মাঝে সবচেয়ে অপরিচিত ও দুর্বল বিশ্বাসগুলোর মধ্যে একটি।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রচারিত এই ‘একত্ববাদ’ বা তাওহীদ পৃথিবীর সমস্ত দর্শন ও চিন্তাধারাকে কাঁপিয়ে দিল। পৃথিবীর সমস্ত দর্শন, মতবাদ ও চিন্তাধারার ওপর এই তাওহীদি আক্বীদা’ বা ‘তাওহীদের বিশ্বাস’ ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করল। যারা মূর্তিপূজায় মগ্ন ছিল, তারাও টিকে থাকার জন্য নিজেদের রূপ বদলাতে বাধ্য হলো। পাদ্রী ও পুরোহিতরা লজ্জিত হয়ে বলতে শুরু করল—”আসলে সৃষ্টিকর্তা একজনই!” ​শিরকের অন্ধকারে ডুবে থাকা ধর্মগুলো তাওহীদের আলোয় নিজেদের বিশ্বাস নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করল। তারা তাদের শিরকী মতবাদ ঢাকতে ‘অবতারবাদ’ কিংবা ‘ত্রিত্ববাদের’ মতো জটিল ও উদ্ভট দার্শনিক ব্যাখ্যা দাঁড় করালো। যেইসব ধর্মে একাধিক উপাস্যের জয়জয়কার ছিল, এই তাওহীদি আক্বীদার কারণে তারাও পর্যন্ত চুপসে যেতে বাধ্য হলো।

এই তাওহীদবাদী আক্বীদার প্রভাবে এই শিরকযুক্ত ধর্মগুলো টিকে থাকার জন্য নিজেদের রূপ বদলাতে বাধ্য হল। টিকে থাকার জন্য এইসব বাতিল ধর্মের পুরাহিত, পাদ্রীরা বলা শুরু করল- ” সৃষ্টিকর্তা আসলে একজনই ! ”

মানুষকে হেদায়েত দেবার জন্য সৃষ্টিকর্তা মাঝে মাঝে বিভিন্ন রূপে পৃথিবীতে অবতরণ করেন যাকে আমরা অবতার বলি, আর আমাদের ধর্মের এমন ধারণাকে অবতারবাদ বলা হয়। শাস্ত্রমতে অবতার বলতে বুঝায় দেবতা কর্তৃক জীবদেহধারণ।

হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান দেবতা বিষ্ণু মোট ১০ বার পৃথিবীতে আগমন করেন মাছ, কচ্ছপ, শুকর, সিংহ, বামন এইসব রুপ ধরে। শাস্ত্রমতে যাকে বলে মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, বামন, কৃষ্ণ, কল্কি, বুদ্ধ, পরশুরাম, রাম ও নৃসিংহ; কোনদিন কোন মুক্তমনা কে দেখছেন এই মাছ, কচ্ছপ, শুকর, বামন এইসব দেবতার পূজা নিয়ে কিছু বলতে। হিন্দুরা পশুপাখি পূজার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত মানবতার অপমান করছে; কিন্তু মুক্তমনারা তাদের কোন দোষ খুঁজে পায় না।

খ্রিস্টানরা বলা শুরু করল, তিনের মাঝে এক এবং একের মাঝে তিন; পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা। এই তিনের সমষ্টিই নাকি ঈশ্বর, ঈশ্বর আলাদা কিছু নয়। ঐ সুকুমার রায়ের আবোলতাবোল আরকি !

শুধু তাই নয়, এসব ধর্মগুরুরা নিজেদের শিরকী মতবাদের পক্ষে বিভিন্ন উদ্ভট দার্শনিক ব্যাখ্যাও দিতে লাগলো। অংশীবাদের কথা মুখে আনতে গীর্জার পাদ্রীরা লজ্জাবোধ করতে শুরু করল। এই আক্বীদায়ে তাওহীদের প্রভাবে শিরকি পদ্ধতির ধর্মগুরুরা নিজেদের ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে একপ্রকার হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করল। শিরকের কথা প্রকাশ্যে বলতে বড় বড় পুরোহিত ও পাদ্রিরা সংকোচ বোধ করতে শুরু করল।

বিশ্ব মানবতার প্রতি আল্লাহর রাসূলের সবচেয়ে বড় উপহার হলো—সুস্পষ্ট তাওহীদ। এই আক্বীদাই সমূলে উৎপাটিত করেছে সকল মিথ্যা প্রভুর রাজত্ব। মানুষের মনোজগতকে করেছে মুক্ত ও স্বাধীন।

এই আক্বীদায়ে তাওহীদের প্রভাবে মানুষের চিন্তা, চেতনা ও বিশ্বাস-অনুভূতিতে সর্বোপরি মানুষের মনোজগতে এক বিরাট পরিবর্তন ঘটে যায়। বিশ্ব মানবতার প্রতি আল্লাহর রাসূলের সবচেয়ে বড় এহসান ছিল এই একত্ববাদী আকিদা, সুস্পষ্ট তাওহীদবাদী চিন্তা চেতনার উপহার দেওয়া। এই তাওহীদবাদী আক্বীদাই সমূলে উৎপাটিত করে সকল বাতিল প্রভুদের রাজত্ব; মুখ থুবড়ে পড়ে গীর্জার ঘন্টা, মন্দিরের শঙ্খ, সিনাগগের শয়তানী আর বুদ্ধের উদ্ভট নির্বাণলাভ তত্ত্ব।

আল্লাহ রাসুল হচ্ছেন একমাত্র মানুষ যিনি এই মানবজাতির উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছেন। আল্লাহর রাসুল আগমন এবং ইসলাম ধর্মের ব্যাপক বিস্তৃতি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে চমকপ্রদ অধ্যায়। আল্লাহর রাসুলের আগমনের ফলে এক নতুন বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত হলো এক নতুন সভ্যতা। আল্লাহর রাসুল আগমন যে শুধু এক নতুন সভ্যতা সৃষ্টি করেছে তা নয় বরং বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে দুঃখ-দুর্দশার পঙ্কিলতা থেকে মুক্তির পথও দেখিয়েছিল।

সৃষ্টির সেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর অসংখ্য দুরুদ বর্ষিত হোক যিনি কুসংস্কার এবং প্রচলিত কুপ্রথাকে দূরীভূত করার জন্য প্রেরিত হয়েছেন এবং তাঁর সাহাবী ও বংশধরদের উপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার রহমত বর্ষিত হোক; যাদের উত্তম প্রচেষ্টায় অন্ধকার যুগের কুসংস্কার সমূহ দূরীভুত হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সন্তুষ্টি তাঁদের উপর অবিরাম বহিত হোক।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button