রেড ইন্ডিয়ানরা জান্নাতে যাবে না জাহান্নামে যাবে ?


সংশয়বাদীরা একটা প্রশ্ন করে প্রায়ই আমাদেরকে বিব্রত করে — ” আমাজন বনের আদিবাসীরা জান্নাতে যাবে না জাহান্নামে যাবে ? কোরআন-হাদিসে নবী-রাসূলের নাম তো এসেছে ৩০ এর কম। ল্যাটিন আমেরিকার কোনো নবী-রাসূল এসেছে কিনা, রেড ইন্ডিয়ানরা জান্নাতে যাবে না, না জাহান্নামে যাবে ” এই চিন্তায় নাস্তিকদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। নিজেদের ঈমানের খবর নেই আছে সারাদিন খালি আমেরিকার আদিবাসীদের হাশর-নশর নিয়ে গবেষণা! আমাদেরকে এখানে একটা জিনিস বুঝতে হবে— আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কখনোই তাঁর কোনো বান্দার উপর জুলুম করবেন না। আমাদের বাড়ির পাশের হিন্দুর যেরকম ভাবে হাশরে হিসাব-নিকাশ হবে, আমাজন বনের আদিবাসীদের সেভাবে হিসাব-নিকাশ হবে না।
“আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব যা আমি তোমাদেরকে দিয়েছি তার ভিত্তিতে।” (সূরা মায়িদা, ৫:৪৮) সূরা মায়েদার ৪৮ নম্বর আয়াত অনুসারে যার কাছে যতটুকু ইলম এসেছে, ঠিক তার ততটুকু ইলম প্রাপ্তির উপরেই আখিরাতে তার বিচার হবে। এখানে কারো উপর জুলুম হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।
সূরা ত্বোহার ৫১ নম্বর আয়াতে, ফেরাউন যখন হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞাসা করল— ”অতীত যুগে যারা মূর্তি পূজা করতো, তাদের পরিণতি কী হবে ? তখন তার উত্তরে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম বলেছেন, তাদের পরিণতি সম্পর্কে জ্ঞান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছেই আছে। আমার রব কখনো ভুল বিচার করেন না। ”
হযরত মূসা আলাইহিস সাল্লাম কিন্তু কাফের ফেরাউনের উত্তরে সরাসরি বলে দেন নাই যে অতীত যুগে যাদের কাছে কোনো ওহীর জ্ঞান আসে নাই, তারা সবাই জাহান্নামী। বরং হযরত মূসা আলাইহিস সাল্লাম পুরো ব্যাপারটাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়েছেন।
কুরআনের এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়—ল্যাটিন আমেরিকার আদিবাসীরা জান্নাতে যাবে না জাহান্নামে যাবে, এটা শুধুমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাই জানেন। তবে তথাকথিত মুক্তমনারা যে জাহান্নামে যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
প্রাচীনকালের নবী-রাসূলদের ব্যাপারে কম তথ্য পাওয়া যায় এই কারণে যে নবী-রাসূলেরা কেউ রাজা-বাদশা ছিলেন না। নবী-রাসূলদের কোনো সেনাবাহিনী ছিল না, কোনো রাজপ্রাসাদ ছিল না। নবী-রাসূলরা মুদ্রায় নিজেদের নাম জারি করতে পারতেন না, তাম্রলিপি, রাজপ্রাসাদের ইমারতে বা লোহার ফটকে নবী-রাসূলদের নাম উৎকীর্ণ থাকত না।
প্রত্নতত্ত্ব, আর্কিওলজি সম্পর্কে যাদের ন্যূনতম ধারণা আছে, তারা জানেন যে—মুদ্রা, তাম্রলিপি, রাজপ্রাসাদের স্থাপত্য লিপি—এগুলো থেকেই প্রাচীন যুগের ইতিহাস জানা যায়। বিশেষ করে প্রাচীন মুদ্রায় কোনো রাজা-বাদশার নাম উৎকীর্ণ থাকলে বোঝা যায় ওই রাজা কখন রাজত্ব করেছেন, কত বছর রাজত্ব করেছেন ইত্যাদি।
নবী-রাসূলরা যেহেতু কোনো রাজা-বাদশা ছিলেন না, তাই স্বাভাবিকভাবেই তাম্রলিপি বা মুদ্রায় তাঁদের নাম উৎকীর্ণ থাকে নাই। প্রাচীন যুগের ইতিহাসে নৃপতি ছাড়া আর কারো নাম সেইভাবে আসে নাই।
তারপর নবী-রাসূলদের দাওয়াতে খুব অল্প লোকই মুসলমান হতেন। বেশিরভাগ নবী-রাসূলের মৃত্যুর পর উনার অনুসারীরাও ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতেন। অনেক নবী-রাসূল শহীদও হয়ে যেতেন।
সেই যুগে জাহেলিয়াত এত তীব্র ছিল যে তাওহীদের বাণী টিকতে পারত না। নবী-রাসূলদেরকে তাঁদের বাণী সহ সমূলে উৎপাটিত করা হতো। সেই জন্য কোনো এলাকায় কোনো নবী-রাসূল আসলেও, তাঁদের মৃত্যুর পরে তাওহীদের বাণীর ছিটেফোঁটাও আর ঐ এলাকায় দেখা যেত না।
হযরত ঈসা আলাইহিস সাল্লাম পৃথিবীতে এসেছেন খুব বেশীদিন আগে নয়, মাত্র ২ হাজার বছর আগে। কিন্তু হযরত ঈসা আলাইহিস সাল্লামের দুনিয়া থেকে আসমানে উত্থিত হবার পর উনার তাওহীদের বাণীর ছিটেফোঁটাও আর বনী ইসরাঈলদের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় নি। আল্লাহর রাসূল পৃথিবীতে না আসলে হযরত ঈসা আলাইহিস সাল্লাম যে একজন নবী হিসাবে পৃথিবীতে এসেছিলেন আমরা সবাই তা ভুলে যেতাম। এভাবেই নবী রাসূলেরা ইতিহাসের পাতায় তাওহীদের আহবায়ক থেকে প্রতিমা পূজায় রুপান্তরিত হতেন।
হযরত ইদরীস আলাইহিস সাল্লাম কে তো সেই যুগের বাদশাহই শহীদ করেছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই ঐ রাজদরবারের দরবারি ঐতিহাসিকরা হযরত ইদরীস আলাইহিস সাল্লামের কথা লিপিবদ্ধ করবেন না। নবুয়ত সব সময় রাজা বাদশাহ, সেনাপতি, গোত্র প্রধানদের মতের বিরুদ্ধেই যেত। আর ইতিহাস লিখা হয় রাজা বাদশাহ, সেনাপতি আর গোত্র প্রধানদের কে উদ্দেশ্যে করেই।
আর সেই জন্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা প্রত্যেক জাতির মাঝে নবী-রাসূল পাঠালেও, সেইভাবে নবী-রাসূলদের ইতিহাস সংরক্ষিত থাকেনি। জাহেলিয়াতের তীব্রতায় নবী-রাসূলদের নামগুলো হারিয়ে গেছে।
আর কোন এলাকায় নবী রাসূল আসা মানে এই নয় যে ঐ এলাকার সব লোক মুসলমান হয়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রচুর সং্খ্যক নবী রাসূল এসেছিল। কিন্তু আরব বিশ্বে জাহেলিয়াত কতটা তীব্র ছিল তা আমরা জানি। আর মানব সভ্যতার সূতিকাগার হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। প্রথম কৃষিকাজ মেসোপোটেমিয়া বা আধুনিক ইরাকেই শুরু হয়েছিল। সেই জন্য মধ্যপ্রাচ্যেই এত সং্খ্যক নবী রাসূল এসেছিলেন।
যেহেতু লক্ষাধীক নবী রাসূল এসেছেন দুনিয়াতে, তাহলে ল্যাটিন আমেরিকাতেও নবী আসতে পারেন। আর আমরা তো মাত্র ৩০ জন নবীদের ঘটনা জানি। বাকিরা হয়তোবা সারা পৃথিবী জুড়েই এসেছিলেন।
যারা কখনো কোন নবী রাসূল পাইনি অর্থাৎ যাদের কাছে কখনো কোন ওহীর বানী আসেনি তাদের আখেরাতে কি ফয়সাল হবে এই ব্যাপারে তাফসির ইবনে কাসীরে একটি রেওয়াত আছে। যাদের মাঝে কোন নবী রাসূল আসেনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা পরীক্ষা নেবার উদ্দেশ্যে তাদের কে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে বলবেন। কিন্তু এই রেওয়াতের ব্যাপারে ফকীহদের আপত্তি আছে। এর কারন হলো আখিরাতের জীবন হচ্ছে প্রতিদান দেয়ার ক্ষেত্র। এখানে নতুন করে পরীক্ষা নেবার কোন সুযোগ নেই। যা পরীক্ষা সব দুনিয়ার জীবনই হয়ে যাবে। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা কখনোই তার কোন নির্দোষ বান্দাকে আগুনে ঝাপ দিতে বলবেন না।
অস্ট্রেলিয়া থেকে শুরু করে ল্যাটিন আমেরিকা, লাখ লাখ আদিবাসীদের কে হত্যা করেছে এই সাদা চামড়ার খৃষ্টানরা। যাদেরকে বর্তমান মুক্তমনারা নিজেদের God Father হিসাবে স্বীকার করে। কোনদিনও দেখলাম না মুক্তমনাদেরকে এই আদিবাসী গনহত্যা নিয়ে কোন কথা বলতে। কিন্তু আদিবাসীদের ঈমান আনা নিয়ে মুক্তমনারা সব সময় টেনশনে থাকে। মুক্তমানদের চোখ সাদা চামড়ার লোকদের গনহত্যা দেখতে পায় না।
প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব এইগুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারনেই সংশয়বাদীরা বিপুল সংখ্যক নবী-রাসূলদের আগমন সম্পর্কে আমাদেরকে প্রশ্ন করে। মুক্তমনারা না বুঝে প্রত্নতত্ত্ব না বুঝে নৃতত্ত্ব, মুক্তমনারা শুধুমাত্র মেয়েদের হায়েজ, নেফাস, রজ:স্রাব, ঋতুস্রাব ছাড়া আর কোনো বিষয়ে স্বচ্ছ জ্ঞান রাখে না।