অন্যান্য ধর্ম

দেখা না দেখার ঈশ্বর বিশ্বাস

সৃষ্টিকর্তা আছে কি নাই এটা নিয়ে সবসময় একটা বিতর্ক থাকে। এই বিতর্কের মূল কারণ হল সৃষ্টিকর্তাকে চর্ম চোক্ষে দেখা যায় না। যেহেতু আল্লাহ সুবহানুওয়াতায়ালা কে চর্মচোক্ষে দেখা যায় না তাই উনি আবার কিভাবে সৃষ্টিকর্তা হয় ? মুসলমানরা আল্লাহকে না দেখে বিশ্বাস করে এটা নিয়ে একটা প্রশ্ন সব সময় মুক্তমনারা আমাদের কে করে থাকে।

 

মুসলমানদের এই ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে নাস্তিকদের এই সমালোচনা নতুন না। প্রায় অনেকদিন ধরেই এটা চলে আসছে। মুসলমানরা না দেখে আল্লাহকে বিশ্বাস করে, মুসলমানরা গোঁড়া এইসব প্রভৃতি। মুক্তমনাদের কথা হল – ” যা দেখি না দুই নয়নে, তা বিশ্বাস করি না গুরুর বচনে। ” অর্থ্যাৎ কাউকে না দেখে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা যাবে না।

আচ্ছা আমি এখন আপনাদেরকে এমন কিছু সৃষ্টিকর্তা দেখাব যাকে চাইলেই দেখা যায়, এমনকি স্পর্শও করা যায়। যেমন শ্রীকৃষ্ণ, রাম, লক্ষন, রামায়ণ, সীতা, প্রভৃতি।

 

আপনাদের কত ঈশ্বর দরকার, সব আমি এখন আপনাদের চোখের সামনে বস্তুগত ভাবে হাজির করতে পারব। কোন নিদ্রিত দেবতা নয় সব জাগ্রত দেবতাদেরকেই আমি আপনাদের চোখের সামনে এনে হাজির করতে পারব। আপনারা চাইলেই তাদেরকে দেখতেও পারবেন, স্পর্শও করতে পারবেন। শুধু চর্মচক্ষে দেখানো নয়, এইসব ঈশ্বরের জন্ম, মৃত্যু, কর্ম, প্রেম সব আমি পুরাণ উপনিষেদ, বেদ, গীতা, থেকে আপনাদের কে জানাতে পারবো। কিন্তু এতে কি লাভ হবে? মুক্তমনারা তো তাদের চোখের সামনেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনেক ঈশ্বর কে দেখতে পাচ্ছে, স্পর্শ করতে পারছে।

কিন্তু মুক্তমনারা কি শ্রীকৃষ্ণ, রাম, লক্ষন, রামায়ন, সীতার উপর ঈশ্বর ভিত্তিক বিশ্বাস স্থাপন করবে ? কখনোই নয়। ঠিক এই কথাটা বৌদ্ধদের গৌতম বুদ্ধ, খৃষ্টানদের যীশুখৃষ্টের উপরও প্রযোজ্য। গৌতম বুদ্ধ, যীশু খৃষ্ট উনাদের কে চোখের সামনে দেখা গেলেও, স্পর্শ করা গেলেও কখনোই মুক্তমনারা গৌতমবুদ্ধ, যীশু খৃষ্ট কে সৃষ্টিকর্তা হিসাবে মেনে নিবে না।

 

পুরা হিন্দুধর্মে সব জায়গায় বলা আছে ঈশ্বর মাঝে মাঝে অবতারের রুপেই আত্মপ্রকাশ করেন। সে হিসাবে অবতারদেরকেই সেইসব ধর্মগ্রন্থে ঈশ্বর হিসাবে ধরা হয়। তবে হিন্দু ধর্মে ব্রক্ষা কে প্রধান ঈশ্বর হিসাবেই মানে। আর বিষ্ণু কেও ঈশ্বর হিসাবে হিন্দুধর্মে ধরা হয়।

 

তাহলে এখন দেখা যাচ্ছে মনুষ্যশ্রেণীর অবতারদের চোখে দেখা গেলেও, স্পর্শ করা গেলেও মুক্তমনারা তাদের কে ঈশ্বর হিসাবে স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছে না। এতগুলো ঈশ্বর কে চোখে দেখা গেলেও তথাকথিত মুক্তমনাদের চোখে এর কোন ব্যবহারিক গুরুত্ব নেই। ব্যাপারটা হল এরকম অনেক ঈশ্বর কে ২ নয়নে দেখা গেলেও সংশয়বাদীরা তাদের কে ঈশ্বর হিসাবে বিশ্বাস করে না। তাই দেখা যাচ্ছে “যাকে দেখি না দুই নয়নে, তাকে বিশ্বাস করি না গুরুর বচনে”, এই কথাটা ঠিক সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের ব্যাপারে আর খাটে না। কারন শ্রীকৃষ্ণ, গৌতম বুদ্ধ, যীশু খ্রিষ্ট উনাদেরকে চোখের সামনে দেখা গেলেও মুক্তমনারা তাদেরকে ঈশ্বর হিসাবে মানতে রাজি নয়।

 

যেহেতু এতগুলো জাগ্রত দেবতাকে চোখে দেখেও মুক্তমনারা তাদেরকে ঈশ্বর হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে না, তাই মুসলমানরা আল্লাহকে না দেখে তার উপর ঈমান আনছে আশা করি মুসলমানদের এই ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে নাস্তিকরা আর কোন কথা বলবে না।

 

আসলে মুক্তমনারাও ঈশ্বর হিসাবে এমন কাউকে চাচ্ছে যাকে স্পর্শ করা যাবে না, যিনি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু হবেন না, দৃষ্টি সীমা যাকে স্পর্শ করতে পারবে না। এটা আসলে মানুষের Basic instinct যে সে সৃষ্টিকর্তা হিসাবে তাকেই স্বীকার করবে যে তার মতো নয়, সৃষ্টিকর্তাকে যদি সরাসরি চোখের সামনেই দেখা যায় তখন তো আর মানুষ তাকে সৃষ্টিকর্তা হিসাবে মেনে নিবে না। এইজন্যই এতগুলো জাগ্রত দেবতাকে চোখের সামনে দেখেও মুক্তমনারা মনের তৃপ্তি পায় না, তারা ইনিয়েবিনিয়ে নিরাকার আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা কেই তাদের সৃষ্টিকর্তা হিসাবে মনে মনে মেনে নিতে চায়।

 

এখানে একটা জিনিস আমাদের বুঝতে হবে সৃষ্টিকর্তা আছে কি না- এটা কিছুতেই বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় হতে পারে না। এখানে অনেকেই তালগোল পাকিয়ে ফেলে যে, এই মহাবিশ্বে সৃষ্টিকর্তা আছে কি না, এটা বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। না, এটা দর্শন শাস্ত্রের বিষয়। একমাত্র Philosophy দর্শন শাস্ত্রই এই মহাবিশ্বের কোনো সৃষ্টিকর্তা আছে কি না সেটা নিয়ে আলোচনা করবে। বিজ্ঞানকে এখানে টেনে আনাটা নিরেট মূর্খামি ছাড়া আর কিছুই নয়। মূলতঃ সায়েন্টিফিক মেথড সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকার কারনেই মানুষ বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরিতে সৃষ্টিকর্তা আছে কিনা সেই পরীক্ষা করতে যায়।

 

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা, তিনি স্থান, কাল, আকৃতি ও বস্তুর ঊর্ধ্বে। মানুষের চোখ বস্তুগত জিনিস দেখতে পারে। যেহেতু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা কোনো বস্তু নন এবং কোনো স্থান বা আকার ধারণ করেন না, তাই তাঁকে চোখ দিয়ে দেখা অসম্ভব।

আকার বলতে বুঝায় দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা। যেহেতু আল্লাহ সুবহানু ওয়া তায়ালা একটি অনন্ত অসীম সত্ত্বা তাই দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা এই শব্দগুলো আল্লাহ সুবহানু ওয়া তায়ালার জাতের সাথে যায় না।

মানুষের ইন্দ্রিয় ও দৃষ্টিসীমা তাঁর বিশালতাকে ধারণ করতে পারে না। “কোনো দৃষ্টিই তাঁকে ঘিরে ফেলতে পারে না, অথচ তিনি সকল দৃষ্টিকে ঘিরে রাখেন” (সূরা আন-আনআম, ৬:১০৩)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button